ড. সৌমেন ভারতীয়া (প্যাট্রন-ইন-চিফ, ব্যতিক্রম গ্রুপ) : ভারতরত্ন ড.ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষ উদযাপনের জন্য যখন আমরা দক্ষিণ অসমকে কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছি, তখন এটি শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠানস্থল নির্বাচন নয়। এর পিছনে রয়েছে একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের আবেগ এবং ভূপেন হাজরিকার সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের যে নিবিড় সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্ক, তাকে নতুন করে স্মরণ ও উদযাপন করার দায়বদ্ধতা। আমাদের কাছে ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষ কেবল একজন কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টিকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়, এটি তাঁর সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই সম্পর্ককে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি সুযোগ। সেই ভাবনা থেকেই ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে দক্ষিণ অসমের চারটি জেলা- কাছাড়, শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি ও ডিমা হাসাও-র সোনাই, লক্ষ্মীপুর, শিলচর, বরখলা, হাইলাকান্দি, কাটিগড়া, উদারবন্দ, ধলাই, রামকৃষ্ণনগর, পাথারকান্দি, আলগাপুর-কাটলিছড়া, উত্তর করিমগঞ্জ, দক্ষিণ করিমগঞ্জ ও হাফলং-এর ১৪টি বিধানসভা সমষ্টিকে যুক্ত করে আয়োজন করা হয়েছে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর শিলচরের ‘সাউথ অসম ভূপেন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতা’র গ্র্যান্ড ফিনালে। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর শিলচরের বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হবে ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষ উদযাপন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা ভূপেন হাজরিকার গান ও ভাবনাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষিণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। অসমের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনও একক ভাষা, অঞ্চল বা ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি, বহু ঐতিহ্য ও মানুষের বহুবিধ অনুভূতির সম্মিলনেই তার পূর্ণতা।
অসমকে যখন আমরা ভাবি, তখন ব্রহ্মপুত্র আমাদের ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য প্রতীক হয়ে ওঠে। আর বরাক উপত্যকা সেই বৃহত্তর অসমেরই এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড যার রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনও একক ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বহু ভাষা, বহু ঐতিহ্য ও বহু মানুষের অনুভূতির সম্মিলনেই তার পূর্ণতা। ব্রহ্মপুত্র ও বরাক দুটি পৃথক নদ-নদী হলেও, তাদের তীর ঘিরে গড়ে উঠেছে অসমের বিস্তৃত জীবন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহুস্তরীয় কাহিনি। তেমনই অসমের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সহাবস্থান ও আদান-প্রদানই গড়ে তুলেছে আমাদের বহুত্বের অনন্য পরিচয়। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও যে গভীর সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা প্রবাহিত, ভূপেন হাজরিকার জীবন ও সৃষ্টি তারই এক অসাধারণ প্রতিফলন। তাঁর শিকড় ছিল ব্রহ্মপুত্রের তীরে, কিন্তু তাঁর সুর অনায়াসে পৌঁছে গিয়েছিল বরাকের মানুষের হৃদয়ে, তাঁর অসমিয়া সত্তার সঙ্গে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। তাই ভূপেন হাজরিকার জীবনকে দেখলে আমরা শুধু একজন মহান শিল্পীর যাত্রা দেখি না, দেখতে পাই ব্রহ্মহ্মপুত্র ও বরাকের মধ্যে, অসমিয়া ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে, ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এক গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রতিচ্ছবি।
ভূপেন হাজরিকার শিকড় ছিল অসমের মাটিতে, তাঁর সৃষ্টির প্রাণে ছিল ব্রহ্মপুত্রের বিস্তার, কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা কখনও কোনও একটি নদী, ভাষা বা ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। তিনি মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন মানুষের ভাষায়। তাঁর বাংলা গান তাঁকে বাংলাভাষী মানুষের ঘরের মানুষ করে তুলেছিল। আর সেই সূত্রেই বরাক উপত্যকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল আরও গভীর, আরও আত্মিক। বরাকের মানুষের কাছে ভূপেন হাজরিকা শুধুমাত্র অসমের একজন কিংবদন্তি শিল্পী নন, তাঁর গান তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুভূতিরও অংশ হয়ে উঠেছে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ কিংবা তাঁর অন্যান্য বাংলা সৃষ্টি শুধু শ্রুতিমধুর গান হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, এগুলি মানুষের জীবন, অনুভূতি ও মানবিকতার সঙ্গে মিশে গিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তৈরি করেছে। এই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ভূপেন হাজরিকা কখনও সংস্কৃতিকে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সংস্কৃতি ছিল মানুষের কাছে পৌঁছনোর ভাষা। নিজের পরিচয়ে দৃঢ় থেকে অন্যের পরিচয়কে সম্মান করা-এই সহজ অথচ গভীর দর্শন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে। তাই তাঁর অসমিয়া গান যেমন অসমের আত্মাকে ধারণ করে, তেমনই তাঁর বাংলা গান বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে এক আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। তাঁর শিল্পে আমরা কোনও সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা দেখি না, বরং দেখি এক সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির আলাপ, এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের পরিচয় এবং এক ভূখণ্ডের সঙ্গে অন্য ভূখণ্ডের আত্মীয়তা।
এই কারণেই বরাক উপত্যকায় তাঁর জন্মশতবর্ষ উদযাপন আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভূপেন হাজরিকার সঙ্গে বরাকের সম্পর্ক শুধুমাত্র তাঁর গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবনের শেষ পর্বেও শিলচরের সঙ্গে তাঁর এক বিশেষ যোগাযোগ ছিল। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে নর্থ-ইস্ট মিউজিক্যাল কনফারেন্সে অংশ নিতে তাঁর শিলচর সফর আজও স্মরণীয়। আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে ২০১১ সালে তাঁর প্রয়াণের পরের সেই মুহূর্ত, যখন তাঁর চিতাভস্ম শিলচরে আনা হয়েছিল এবং বরাক উপত্যকার অসংখ্য মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছিলেন। কোনও শিল্পীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটা গভীর হলে তাঁর শেষ যাত্রাতেও একটি সমগ্র অঞ্চল নিজের মানুষকে বিদায় জানাতে পথে নেমে আসে-সেই প্রশ্নের উত্তর সেই দিন বরাক দিয়েছিল।
তাই আমরা যখন তাঁর জন্মশতবর্ষে শিলচরের বঙ্গভবনে মিলিত হচ্ছি, তখন আসলে আমরা কোনও দূরের কিংবদন্তিকে স্মরণ করছি না। আমরা এমন একজন মানুষকে স্মরণ করছি, যিনি অসমের মাটি থেকে উঠে এসে বরাকের মানুষের হৃদয়েও নিজের জন্য একটি ঘর তৈরি করেছিলেন। এই ঘর তৈরি হয়েছিল ভাষার মাধ্যমে, সুরের মাধ্যমে, মানবতার মাধ্যমে। এই সম্পর্কের কোনও প্রশাসনিক সীমানা নেই, কোনও রাজনৈতিক সংজ্ঞা নেই। এটি মানুষের তৈরি সম্পর্ক-যে সম্পর্ক গানকে মাধ্যম করে এক ভূখণ্ডকে আরেক ভূখণ্ডের কাছে নিয়ে আসে।
আজকের সময়ে এই সম্পর্ককে নতুন করে সামনে আনা আরও জরুরি। আমাদের চারপাশে যখন পরিচয়কে কেন্দ্র করে দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তখন ভূপেন হাজরিকার জীবন আমাদের অন্য একটি পথের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই পথ বিভেদের নয়, সংযোগের; দূরত্বের নয়, সংলাপের; একরূপতার নয়, বৈচিত্র্যের। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, একজন মানুষ নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুগত থেকেও অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল হতে পারেন।
আমাদের কাছে অসম ও বরাক উপত্যকার সম্পর্ক কোনও পৃথক দুই সত্তার সম্পর্ক নয়; এটি একই বৃহত্তর ভূখণ্ডের দুই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিসরের আত্মীয়তা। বরাক উপত্যকা অসমের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর তার নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বৃহত্তর অসমের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তাই বরাকের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা মানে দূরত্ব তৈরি করা নয়; বরং অসমের বহুত্ববাদী চরিত্রকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্যেই গড়ে উঠতে পারে আরও দৃঢ় এক আত্মীয়তার বন্ধন। ভূপেন হাজরিকার জীবন ও সৃষ্টিকে আমরা সেই সমন্বয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্তে দেখি। তিনি নিজে অসমিয়া হয়েও বা অসমিয়া শিকড়ের প্রতি গভীরভাবে অনুগত থেকেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছিলেন, মানুষের অনুভূতির কাছে পৌঁছেছিলেন ভাষার সীমা অতিক্রম করে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়-নিজের পরিচয়ে গভীরভাবে স্থিত থেকেও অন্যের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা যায়, নিজের মাটিকে ধারণ করেও বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়।
এই জায়গাতেই ব্যতিক্রম গ্রুপের ভূমিকা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের কাছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কখনও শুধুমাত্র মঞ্চ, আলো, শিল্পী ও দর্শকের সমাবেশ নয়। সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষকে কাছে আনা, স্মৃতিকে জীবন্ত রাখা এবং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সংযোগ স্থাপন করা। সেই দায়িত্ব থেকেই আমরা ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষকে শুধু একটি স্মরণানুষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা চাই, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে অসম ও বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় লেখা হোক। আমরা চাই, বরাকের তরুণ প্রজন্ম ভূপেন হাজরিকাকে শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে নয়, এমন একজন সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে চিনুক, যিনি ভাষা ও ভৌগোলিক দূরত্বকে সেতুতে পরিণত করেছিলেন।
ব্যতিক্রম গ্রুপের সঙ্গে ভূপেন হাজরিকার এই সম্পর্কও নতুন নয়। বছরের পর বছর আমরা তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টিকে বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে আগরতলা, কলকাতা-বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে: ভূপেন হাজরিকা কোনও একটি অঞ্চলের শিল্পী নন। তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক সেতু, যার এক প্রান্ত অসমে, অন্য প্রান্ত বাংলায়, আর যার বিস্তার ভারত, বাংলাদেশ তথা গোটা বিশ্বের মানুষের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেই সেতুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রান্ত বরাক উপত্যকা। তাই তাঁর জন্মশতবর্ষে আমরা সেই সেতুর ওপর দাঁড়িয়েই তাঁকে স্মরণ করতে চাই।
শিলচরকে এই আয়োজনের কেন্দ্র করার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে একটি প্রতীকী বার্তাও দিতে চাই। ব্রহ্মপুত্রের সুর যেন বরাকের তীরে এসে মিশে যায়, আর বরাকের ভাষা ও অনুভূতি যেন ব্রহ্মপুত্রের তীরে পৌঁছে যায়। ভূপেন হাজরিকার সঙ্গীতের মতোই আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও যেন কোনও সীমানায় থেমে না যায়। কারণ নদী কখনও শুধু জল বহন করে না, নদী বহন করে মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, স্বপ্ন ও সম্পর্ক। ব্রহ্মপুত্র ও বরাকও তেমনই-দুটি নদী, দুটি উপত্যকা, কিন্তু বৃহত্তর এক সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের দুটি স্পন্দন।
এই জন্মশতবর্ষের প্রকৃত সার্থকতা আমাদের কাছে কোনও একটি সফল অনুষ্ঠান নয়। আমরা চাই, শিলচরের এই আয়োজনের পর কোনও এক তরুণ অসমিয়া শিল্পী যেন বরাকের বাংলা গানকে নিজের সংস্কৃতির কাছের একটি সুর হিসেবে অনুভব করেন। কোনও এক তরুণ বাঙালি যেন ভূপেন হাজরিকার অসমিয়া গান শুনে অসমের মাটির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হন। কোনও একজন শ্রোতা যদি তাঁর গান শুনে উপলব্ধি করেন যে ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের অনুভূতি আলাদা নয়-তাহলেই আমাদের এই আয়োজন সার্থক।
আমরা চাই, ভূপেন হাজরিকার গান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে আরও বহুদিন প্রতিধ্বনিত হোক। তাঁর অসমিয়া গান পৌঁছে যাক আরও বিস্তৃত পরিসরে। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নতুন
প্রজন্ম আবিষ্কার করুক এমন এক অসমকে, যেখানে বহুত্ব বিভেদের কারণ নয়, বরং সৌন্দর্যের উৎস, এমন এক বরাককে, যার স্বাতন্ত্র্য বৃহত্তর অসমের সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে, এবং এমন এক ভারতকে, যেখানে ভাষা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং আরও গভীর সম্পর্কের সুযোগ তৈরি করে।
ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষ আমাদের কাছে তাই শুধু অতীতের এক মহান শিল্পীকে স্মরণ করার মুহূর্ত নয়। এটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোরও সময়। আমরা কেমন অসম চাই? কেমন সম্পর্ক চাই ব্রহ্মপুত্র ও বরাকের মধ্যে? কেমন ভবিষ্যৎ চাই আমাদের সন্তানদের জন্য? ভূপেন হাজরিকার উত্তর হয়তো তাঁর গানেই লুকিয়ে আছে মানুষের পাশে মানুষ, সংস্কৃতির পাশে সংস্কৃতি, নদীর সঙ্গে নদীর মিলন এবং হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ।
শতবর্ষের এই সন্ধিক্ষণে তাই বরাকের তীরে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয়, ভূপেন হাজরিকার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর গান গাওয়া নয়, তাঁর দর্শনকে জীবনের অংশ করে নেওয়া। যদি তাঁর সুর আমাদের আরও কাছে আনে, যদি তাঁর গান আমাদের একে অন্যকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শেখায়, যদি তাঁর স্মৃতি ব্রহ্মপুত্র ও বরাকের মধ্যে আরও দৃঢ় এক সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করে-তবেই তাঁর জন্মশতবর্ষ সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে।
ভূপেন হাজরিকা আমাদের শিখিয়েছেন, নদী বিভাজন করে না-নদী পথ তৈরি করে। ভাষা মানুষকে আলাদা করে না-ভাষা অনুভূতির নতুন দরজা খুলে দেয়। সংস্কৃতি দেয়াল তোলে না-সংস্কৃতি সেতু নির্মাণ করে। আর সেই সেতুর ওপর দাঁড়িয়েই আজ আমরা বরাকের তীরে তাঁকে স্মরণ করছি।
এ যেন শুধু ভূপেন হাজরিকাকে স্মরণ নয়, এ অসমকে অসমের সঙ্গে, ব্রহ্মপুত্রকে বরাকের সঙ্গে এবং মানুষকে মানুষের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারই হোক তাঁর জন্মশতবর্ষের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।












