বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শ্রীভূমি : ভারত-বাংলা সীমান্তের সুতারকান্দি বিএসএফ ক্যাম্পে বৃহস্পতিবার এক আবেগঘন পরিবেশে পালিত হল পবিত্র রাখিবন্ধন উৎসব। শ্রীভূমির অগ্রণী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন খুশি স্মৃতি সংস্থার বোনেরা ১৭১ নং ব্যাটালিয়নের জওয়ানদের হাতে রাখি পরিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করলেন।
অনুষ্ঠানে নিজের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে ১৭১ নং ব্যাটালিয়নের সুতারকান্দি কোম্পানি কমান্ডার উমেশ কুমার বলেন, “আমরা ভারতের নানা প্রান্ত থেকে এসেছি, পরিবার-পরিজন ছেড়ে। রাখিবন্ধন আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন, এই দিনের জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু আজ আমাদের সব অভাব-আক্ষেপ পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সুতারকান্দি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকা বোনেরা আমাদের ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিতে এসেছেন। তাদের ভালোবাসার অটুট বন্ধনে আমরা আপ্লুত। আমরা তাদের নিকট কৃতজ্ঞ থাকব এবং তাদের মঙ্গল কামনা করছি। মানুষের ভালোবাসাই আমাদের শক্তি।”
খুশি স্মৃতি সংস্থার পক্ষে আইনজীবী বর্ণিতা সেন বলেন, “যারা আমাদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাদের জন্যই ভারত-বাংলা সীমান্ত সুরক্ষিত।”
সংস্থার পক্ষে মৌসুমী দাস বণিক বলেন, “যারা নিজের বাড়িঘর ছেড়ে এত দূরে এসে দেশের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তারা যাতে বাড়ির কথা মনে না করেন, তাই আমরা তাদের হাতে রাখি পরিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছি মাত্র।”

রাখিবন্ধনের ইতিহাস তুলে ধরলেন উপদেষ্টারা:
অনুষ্ঠানে রাখিবন্ধনের ইতিহাস তুলে ধরেন সংস্থার উপদেষ্টারা। উপদেষ্টা সৌমিত্র পাল বলেন, চিতোরের রানি কর্ণবতী ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে একটি রাখি পাঠান। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করলে বিধবা রানি কর্ণবতী অসহায় বোধ করে হুমায়ুনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কর্ণবতীর রাখি পেয়ে অভিভূত হয়ে হুমায়ুন চিতোর রক্ষায় সৈন্য পাঠান। যদিও সৈন্য পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়, বাহাদুর শাহ দুর্গ জয় করে নেন। কথিত আছে, ১৫৩৫ সালের ৮ মার্চ সম্ভ্রম রক্ষায় রানি কর্ণবতী ১৩,০০০ পুরস্ত্রীকে নিয়ে জহর ব্রত পালন করে আগুনে আত্মাহুতি দেন। পরে হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে উৎখাত করে কর্ণবতীর ছেলে বিক্রমজিৎ সিংকে সিংহাসনে বসান।
সংস্থার উপদেষ্টা অরূপ রায় বলেন, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেছিলেন। তিনি কলকাতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম ভাই-বোনকে একতার প্রতীক হিসেবে রাখি বন্ধন পালনের আহ্বান জানান। সেই সময় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা চরমে ছিল। ব্রিটিশ সরকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করতে বাংলাকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯০৫ সালের জুনে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন এবং আগস্টে আইন পাস হয়, যা কার্যকর হয় ১৬ অক্টোবর, ১৯০৫। এই বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে এবং হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগাতে রবীন্দ্রনাথ সবাইকে রাখি বন্ধনের ডাক দেন এবং “বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান” গানটি লেখেন। আমরা আজ ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করে রাখি বন্ধন পালন করছি।

অনুষ্ঠানের বিস্তারিত:
অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক অমৃত লাল বণিক জানান, পবিত্র রক্ষা বন্ধন উপলক্ষে শ্রীভূমি জেলার ভারত-বাংলা সীমান্ত এলাকা সুতারকান্দি বিএসএফ ১৭১ নং ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পে ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিনটি উদযাপিত হয়। ধর্মীয় রীতি মেনে প্রদীপ জ্বালিয়ে, সেনা ভাইদের বরণ করে বিজয় তিলক পরিয়ে, ফুল ছিটিয়ে রাখি পরিয়ে দেন সংস্থার সদস্যরা।
এদিন বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার উমেশ কুমারকে উত্তরীয় দিয়ে বরণ করেন খুশি স্মৃতি সংস্থার পক্ষে অমৃত লাল বণিক। রক্ষা বন্ধনের স্মারক তুলে দেন সৌমিত্র পাল, অসিত দত্ত, মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য, অরূপ রায় প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মঞ্জুশ্রী চক্রবর্তী, উমা পাল, বর্ণিতা সেন, অর্পিতা রায়, শ্রাবণী পাল, রুবি মল্লিক, মীনাক্ষী দাস, রুবি দাস, তনুশ্রী রায়, সুতপা সেন, রিমা দেব, রাজশ্রী চক্রবর্তী, বিশ্বায়ন সেন ও বিস্মিতা সেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে রাখি বন্ধনের সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও বন্দেমাতরম পর পর তিনটি সঙ্গীত সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন মৌসুমী দাস বণিক, মঞ্জুরি চৌধুরী, অর্পিতা দাস ধর, শ্যামা দাস ধর, জিমি ধর, সন্ধ্যা কর। তবলায় ছিলেন সুমন ভদ্র। নৃত্যে আরোহী ধর, ভাইয়ের ভূমিকায় তুর্জ ধর ও সায়নিক দে এবং ভারত মাতার ভূমিকায় ভাগ্যশ্রী চক্রবর্তী অংশ নেন।












