,

ডিমা হাসাওকে শিলচরস্থিত আসাম সচিবালয়ের আওতায় আনার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে স্মারকলিপি প্রদান

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর : দক্ষিণ অসমের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও সহজ, কার্যকর ও জনমুখী করার লক্ষ্যে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করল হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন কমিটি, কাছাড় জেলা ইউনিট। আজ ২৮ আগস্ট, শুক্রবার বিকেল ৩টায় আসাম সরকারের বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তরের যুগ্মসচিবের মাধ্যমে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্দেশে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপির…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর : দক্ষিণ অসমের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও সহজ, কার্যকর ও জনমুখী করার লক্ষ্যে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করল হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন কমিটি, কাছাড় জেলা ইউনিট। আজ ২৮ আগস্ট, শুক্রবার বিকেল ৩টায় আসাম সরকারের বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তরের যুগ্মসচিবের মাধ্যমে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্দেশে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

স্মারকলিপির মূল দাবি হল—বর্তমানে কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দিকে নিয়ে যে ‘Assam Secretariat, Barak Valley, Silchar’ পরিচালিত হচ্ছে, তার কার্যকরী ও প্রশাসনিক আওতায় ডিমা হাসাও জেলাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বরাক উপত্যকার জন্য শিলচরে আঞ্চলিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। ‘Mini Secretariat, Barak Valley’-কে উন্নীত করে ‘Assam Secretariat, Barak Valley, Silchar’ করা এবং রাজ্য সরকারের ৫৯টি দপ্তরের মধ্যে ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কার্যক্রম শিলচর থেকে পরিচালনার উদ্যোগ দক্ষিণ অসমের মানুষের জন্য প্রশাসনকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে।

তবে কমিটির মতে, এই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন প্রশাসনিক সুবিধার পরিধি নির্ধারণের সময় শুধু জেলার সীমানাকে নয়, মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা ও যোগাযোগের পথকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। একজন মানুষ কোন শহরে চিকিৎসার জন্য যান, কোথায় সন্তানকে পড়াতে পাঠান, কোথায় ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, কোন শহরের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত—এসব বিষয়ও একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে ডিমা হাসাওয়ের সঙ্গে শিলচরের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘদিনের। ডিমা হাসাওয়ের বহু মানুষ চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পরিষেবার জন্য শিলচরের উপর নির্ভরশীল। তাই ডিমা হাসাওকে শিলচরস্থিত আঞ্চলিক সচিবালয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব কোনো নতুন বা কৃত্রিম প্রশাসনিক সম্পর্ক তৈরি করবে না, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের বাস্তব যোগাযোগকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেবে।

সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও শিলচর ও ডিমা হাসাওয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুস্পষ্ট সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিলচর–হাফলং সড়কপথ দুই অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একইভাবে লামডিং–শিলচর রেলপথ, যা ডিমা হাসাওয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, শিলচর ও পাহাড়ি জেলার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই রেলপথে প্রতিদিন ছাত্রছাত্রী, রোগী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সরকারি কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যাতায়াত করেন।

ডিমা হাসাও ও শিলচরের সম্পর্ক শুধু রাস্তা ও রেলপথেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং ক্ষেত্রেও শিলচরের সঙ্গে ডিমা হাসাওয়ের একটি প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক সংযোগ রয়েছে। ডিমা হাসাওকে পরিষেবা প্রদানকারী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কার্যালয় শিলচরে অবস্থিত। এর ফলে বাস্তব ক্ষেত্রেই শিলচর ডিমা হাসাওয়ের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ডিমা হাসাওয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য শিলচরে আসে। Assam University, G.C. University, NIIT, Barak Valley Engineering College, Silchar Polytechnic-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিমা হাসাওয়ের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করছে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার জন্য নিয়মিত মানুষের এই যাতায়াত দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

স্মারকলিপিতে জনসংখ্যার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা এবং ২০২৬ সালের প্রক্ষেপিত হিসাব অনুযায়ী কাছাড়, শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি ও ডিমা হাসাও—এই চারটি জেলার মোট প্রক্ষেপিত জনসংখ্যা প্রায় ৪৫.১৭ লক্ষ। এর মধ্যে ডিমা হাসাওয়ের প্রক্ষেপিত জনসংখ্যা প্রায় ২.৫২ লক্ষ। অর্থাৎ ডিমা হাসাওকে এই প্রশাসনিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করা হলে আরও প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ শিলচরস্থিত আঞ্চলিক সচিবালয়ের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পরিষেবার কাছাকাছি আসতে পারবেন।

কমিটির মতে, ডিমা হাসাও একটি প্রধানত পার্বত্য জেলা হওয়ায় প্রশাসনিক পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি সেখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে যদি কোনো সরকারি কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গুয়াহাটি যেতে হয়, তাহলে সময়, অর্থ ও শ্রম—তিনটিই বেশি ব্যয় হয়। অথচ শিলচরের সঙ্গে ডিমা হাসাওয়ের ইতিমধ্যেই সড়ক ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। ফলে শিলচরকে আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে মানুষের উপর এই অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিলচরে পরিচালিত হতে যাওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর—স্বাস্থ্য, উচ্চশিক্ষা, বিদ্যালয় শিক্ষা, কৃষি, বন ও পরিবেশ, পূর্ত, সড়ক, জলসম্পদ, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন, রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশু উন্নয়নসহ বহু দপ্তরের সঙ্গে ডিমা হাসাওয়ের মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ডিমা হাসাওকে এই আঞ্চলিক সচিবালয়ের কার্যকরী আওতায় আনা হলে এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সমন্বয় আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডিমা হাসাওয়ের মানুষ ইতিমধ্যেই বরাক উপত্যকার যেকোনো উপযুক্ত স্থানে গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি তাঁদের আন্তরিক ও সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। হাইকোর্ট বেঞ্চের দাবির প্রতি এই সমর্থন কেবল একটি প্রশাসনিক বা বিচারিক দাবির প্রতি সমর্থন নয়; এর মধ্য দিয়ে ডিমা হাসাওয়ের মানুষের সঙ্গে বরাক উপত্যকার বিদ্যমান যোগাযোগ, যাতায়াতের সুবিধা এবং আঞ্চলিক নির্ভরতার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কমিটির মতে, হাইকোর্ট বেঞ্চের দাবির ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ—ভৌগোলিক নৈকট্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, যাতায়াতের সময়, জনসুবিধা এবং বিদ্যমান আঞ্চলিক সম্পর্ক—সেই একই বাস্তব বিষয়গুলি ডিমা হাসাওকে শিলচরস্থিত আঞ্চলিক সচিবালয়ের আওতায় আনার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

আজকের স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে এই বিষয়টির প্রতি সংহতি জানিয়ে ডিমা হাসাও জেলার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি এবং সমর্থন এই দাবিকে আরও বৃহত্তর দক্ষিণ অসমের মানুষের একটি সম্মিলিত প্রত্যাশার রূপ দিয়েছে।

আজকের কর্মসূচিতে অ্যাডভোকেট ধ্রুব কুমার সাহা, প্রসেনজিত দেব, তৈমুর রাজা চৌধুরী, শান্তুনু নায়েক, বিভাশ রঞ্জন দেব, পেরাম ওয়ালুংভেনেওমি, পামা চক্রবর্তী, ধর্মানন্দ দেব, দেবোমিতা চক্রবর্তী, জ্যোতির্ময় নাথ, প্রতিমা ঘোষ, সুপর্ণা চৌধুরী, সিহাব উদ্দিন, সাধন পুরকায়স্থ, সুমিতা ঘোষ, পান্না চক্রবর্তী-সহ কমিটির অন্যান্য সদস্য ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ডিমা হাসাওকে শিলচরস্থিত Assam Secretariat, Barak Valley-এর আওতায় আনার দাবি ডিমা হাসাওয়ের বর্তমান জেলা মর্যাদা, জেলা প্রশাসন বা ভৌগোলিক পরিচয় পরিবর্তনের কোনো দাবি নয়। ডেপুটি কমিশনারসহ বর্তমান জেলা প্রশাসনের কাঠামো যথারীতি বহাল থাকবে। প্রস্তাবটি শুধুমাত্র শিলচরস্থিত আঞ্চলিক সচিবালয় ও সেখান থেকে পরিচালিত রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলির কার্যকরী আওতা সম্প্রসারণের বিষয়ে।

কমিটির বিশ্বাস, কাছাড়, শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি ও ডিমা হাসাওকে নিয়ে একটি সুসংযুক্ত প্রশাসনিক অঞ্চল গড়ে উঠলে দক্ষিণ অসমে উন্নয়নমূলক কাজের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। সড়ক, রেল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন, বন ও পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলসম্পদ, বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহণ, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চার জেলার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব হবে।

স্মারকলিপিতে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তাই মূলত সাতটি বিষয়ে আবেদন জানানো হয়েছে—ডিমা হাসাওকে Assam Secretariat, Barak Valley, Silchar-এর কার্যকরী আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা; প্রয়োজনীয় সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা আদেশ জারি করা; সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির SOP ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করা, ডিমা হাসাওয়ের সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে শিলচরস্থিত দপ্তরগুলির পরিষেবা গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া, ভৌগোলিক নৈকট্য, সড়ক-রেল যোগাযোগ, জনসংখ্যা, যাতায়াতের সময় ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বিবেচনায় নেওয়া, হাইকোর্ট বেঞ্চের দাবির প্রতি ডিমা হাসাওবাসীর সমর্থনকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং সর্বোপরি দক্ষিণ অসমে বিকেন্দ্রীকরণ ও জনমুখী প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করা।

হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টির গুরুত্ব ও মানুষের বাস্তব সমস্যাকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং ডিমা হাসাওকে সঙ্গে নিয়ে শিলচরস্থিত আঞ্চলিক সচিবালয়ের প্রশাসনিক পরিসর সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

কমিটির বক্তব্য, প্রশাসন মানুষের কাছে আসার অর্থ শুধু একটি নতুন অফিস স্থাপন করা নয়, এর প্রকৃত অর্থ হল—মানুষের সময় বাঁচানো, যাতায়াতের কষ্ট কমানো, সরকারি পরিষেবা সহজ করা এবং নাগরিককে তার প্রয়োজনের সময় প্রশাসনের আরও কাছে নিয়ে আসা। সেই লক্ষ্যেই ডিমা হাসাওকে Assam Secretariat, Barak Valley, Silchar-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার এই আবেদন করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *