বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবারও ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশ’ শীর্ষক মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এই অনুষ্ঠান নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মঞ্চের কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, উনিশ কোনও ভাবেই রাজনীতি মুক্ত নয়। যতদিন মঞ্চ থাকবে শিলচরের বুকে, ১৭ মে-ই হবে ‘উনিশের মহা পথচলা’। সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে একথাই জানালেন সদস্যরা। তাঁরা আরও জানান, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের সুর নিয়ে উনিশের ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে আগামী ১৭ মে উনিশের মহাপথচলায় পা মেলাবে মঞ্চ। এই ‘মহা পথচলা’য় সবাইকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশকে ভাবনায় রেখে এবং মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের তালিকা নিয়ে সোমবার বিকেল চারটায় শিলচরের মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সংস্থার সভাকক্ষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের সদস্যরা বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তাঁরা প্রথমেই জানান, ১৭ মে বিকেল তিনটার পর শহিদ স্মরণে দলমত নির্বিশেষে উনিশের মহা পথচলায় পা মেলাবেন শতশত সচেতন মানুষ। মিছিল শুরু হবে শহরের রাঙ্গিরখাড়ি মোড় থেকে শেষ হবে ডিএসএ পর্যন্ত। তাঁরা জানান, যতদিন মঞ্চ থাকবে ভাষার লড়াই চলবে। এই অঙ্গীকারের কথা শুনিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের সভাপতি বিশ্বজিৎ দাশ, সহ-সভাপতি মনোজ দেব জানিয়েছেন, যতদিন মঞ্চ থাকবে ১৭ মে শিলচরের বুকে মহা পথচলা হবেই। কোনও বিভাজন রেখা টানার চেষ্টা হলেও তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অজয়কুমার রায় কোনও নামোল্লেখ না করে শোনান, ‘এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠনের ব্যক্তি উদ্যোগ নিয়ে’ উনিশের পথচলা একইদিনে করার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চিঠি দিয়ে পৃথক একটি সভাও করেছেন। আবার কোনও এক ব্যক্তি ওই মিটিংয়ে মুখ ফসকে বলেও ফেলেছেন, সরকার বিরোধী মিছিলে না গিয়ে ১৯ শের সকালে একইদিনে মিছিল করার। তো পথচলায় কি রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? অজয়কুমার রায় তাঁর বক্তব্যে সংযোহন করেছেন, পথচলা আয়োজন করার সিদ্ধান্তের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন মঞ্চের বর্তমান সভাপতি বিশ্বজিৎ দাশ। আর চারবারের আহ্বায়ক ছিলেন নিখিল পাল। এ নিয়ে মঞ্চ নাগরিক সভা করেছে। এই নাগরিক সভায় শৌরোহিত্য করেছিলেন সম্মিলিত স্যাংস্কৃতিক মঞ্চের প্রথম সম্পাদক সূরত ভট্টাচার্য। কয়েকবছর তিন দিন চলত পথচলা। দু’বছর আগে তা মুটিয়ে হ্রাস পায়। এই যে একতরফাভাবে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত মনে গেঁথে মিটিং ডেকে ফেলা হল, কেন? এই বিষয়ে মঞ্চের সঙ্গে তো আলাদাভাবে আগে বসা যেত। সমস্যা কোথায় ছিল? তারিখ কেন ফ্যাক্টর হচ্ছে বারবার? মঞ্চ-র প্রতিনিধিদের অন্য মিছিলেও দেখা যাবে পা মেলাতে। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। বলেছেন মঞ্চ-প্রতিনিধিরা। বিশ্বজিৎ দাশ জানান, ১৯৬১ সালে রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বরাক উপত্যকার সরকারি কাজে বাংলা ভাষাকে বর্জন করার চক্রান্ত চলছে বহু বছর থেকে। তমালকান্তি বণিক বলেছেন, মিটিং ডাকার আগেই ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল ১৯শে মে একদিনে পথচলার সিদ্ধান্তকে সিলমোহর দেওয়া হবে। মঞ্চকে আহ্বান করা হলেও তা ছিল নিছক রেকর্ডে থাকার জন্য। সম্মেলনে বিশ্বজিৎ দাশ আরও বলেন, শুধু বরাক উপত্যকা নয়, গোটা দেশ বর্তমানে কঠিন সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা হচ্ছে। হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তানের ভাবনাকে সামনে রেখে। এই কঠিন সময় থেকে উত্তোরণের পথ দেখাতে পারে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রক্ষা করতে পারে সমাজকে বিভক্ত হওয়া থেকে। তিনি এবং তমালকান্তি বণিক প্রায় একসুরে বলেছেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ২৭ বছর থেকে। আজকের সময় ১৯শে মে নিয়ে আন্দোলিত হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে মতামত জানান সত্যজিৎ বসু জয়, ঋষিকেশ চক্রবর্তী, দেবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়, গোরা চক্রবর্তী, সায়ন রায় কোটন, দেবরাজ ভট্টাচার্য, বিপ্লব দে, অপু সুত্রধর, পুনম ধর প্রমুখ। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ শিলচরের সাধারণ সম্পাদক অজয়কুমার রায় বলেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ এবং প্রসার ও প্রচারে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯ শে মে ভাষা শহিদ দিবসের আবহে মঞ্চ প্রতিবছর ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ- চেতনায় উনিশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। একমাসব্যাপী চলমান অনুষ্ঠানমালায় থাকে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথনাটক, আলোচনা সভা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, চিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা। প্রতিবছরের মতো এবছরও ১৭ মে থাকছে মহা পথচলা। এক মাস ব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু হবে ১ মে। শেষ হবে ৩০ মে। তিনি জানান, ২ মে সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন ও ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত হবে আলোচনা সভা। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা থেকে। মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সমিতির সভাগৃহে। ৬ মে বিকেল তিনটায় শোভাযাত্রা। সন্ধ্যা ৫ টায় গোলদিঘি মলে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘সবুজের আঙিনায়’। ৯ মে সকাল ১০ টায় গান্ধীভবনে সব সংস্থা ও স্কুলের রাবীন্দ্রিক অনুষ্ঠান থাকবে। সন্ধ্যা ৫ টা ৩০ মিনিটে মঞ্চের ব্যবস্থাপনায় পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সম্মাননা প্রদান। হবে পুস্তক উন্মোচন। চন্দ্রপুরে সকাল ১০ টা থেকে চিকিৎসা শিবির। ১০ মে রবিবারে। ১১ মে কলকাতা থেকে আমন্ত্রিত শিল্পী অ্যারিনা মুখোপাধ্যায় ও শীর্ষ রায় শোনাবেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠানটি শুরু হবে সন্ধ্যা ৫ টায়। ১২ মে হবে শিশুমেলা। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়, মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সমিতির কার্যালয়ের সভাগৃহে। ১৩ মে শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ে সন্ধ্যা ৫ টা ৩০ মিনিট থেকে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠান। ১৪ মে থাকবেন কলকাতার আমন্ত্রিত শিল্পী মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। গান্ধীভবনে। রক্তদান শিবির ১৫ মে। ১৬ মে সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের চিত্রকলা প্রদর্শনী, বহুভাষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সম্মাননা প্রদান। ১৭ মে বিকেল সাড়ে তিনটায় পথচলা। এদিনই ক্রোড়পত্র ‘সময়ের বার্তা’ উন্মোচিত হবে। ১৮ মে বৃহস্পতিবার বেলা ১২ টা থেকে গান্ধীবাগের সামনে পার্ক রোডে প্রতিবাদী পথ আলপনা অঙ্কন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। হবে পথ নাটক। ১৯ মে মঙ্গলবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ভাষা শহিদ স্টেশন ও শিলচর শ্মশানঘাটের শহিদ বেদীতে মাল্যদান। সকাল ১০ টায় গান্ধীভবনে লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠান। বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে গান্ধীবাগের শহিদ বেদীতে মাল্যদান। সন্ধ্যা ৫ টা ৩০ মিনিটে গান্ধীভবনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মাননা প্রদান। সম্মাননা দেওয়া হবে সুমিত্রা দত্ত, শিবানী ব্রহ্মচারীকে। মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হবে আনন্দময়ী ভট্টাচার্য ও পরিমল দে-কে। ২০ মে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় বঙ্গভবনে কলকাতার প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী অভিজিৎ বসুর অনুষ্ঠান। ৩০ মে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা থেকে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে গান্ধীভবনে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ থেকে এদিন বহুস্বরের পক্ষে ৬ টি দাবিতে আওয়াজ তোলার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। দাবিগুলি হল, ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দিতে হবে। মেহরোত্রা কমিশনের রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। সরকারি স্কুল বন্ধ করে বেসরকারি স্কুল চালু করা চলবে না। প্রত্যেক ভাষিক জনগোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রীদের ন্যূনতম প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করতে হবে। শিলচর-সৌরাষ্ট্র মহাসড়কের কাজ অতি সত্বর সমাপ্ত করতে হবে। অতিসত্বর শিলচর রেল স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ভাষা শহিদ স্টেশন শিলচর করতে হবে। এদিকে, গান্ধীভবন আধুনিকীকরণের দাবি নিয়েও সোচ্চার ছিলেন মঞ্চের কর্মকর্তারা। ছোটছোট সংস্থার পক্ষে বড় হলে অনুষ্ঠান করার ক্ষমতা না থাকার ফলে গান্ধীভবনে অনুষ্ঠান করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে গান্ধীভবন প্রেক্ষাগৃহের যে অবস্থা এই হলে অনুষ্ঠান করার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িছে। অতিসত্বর গান্ধীভবন প্রেক্ষাগৃহ মেরামত করার দাবি জানিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের সদস্যরা।
যতদিন মঞ্চ থাকবে শিলচরের বুকে, ১৭ মে-ই হবে ‘উনিশের মহা পথচলা’: সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবারও ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশ’ শীর্ষক মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এই অনুষ্ঠান নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মঞ্চের কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, উনিশ কোনও ভাবেই রাজনীতি মুক্ত নয়। যতদিন মঞ্চ থাকবে শিলচরের বুকে, ১৭ মে-ই হবে ‘উনিশের মহা পথচলা’। সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে একথাই জানালেন সদস্যরা। তাঁরা আরও জানান, বৈচিত্রের…
Previous Post
Next Post
Leave a Reply
Latest News












