নীতিশ বিশ্বাস:
বাংলা বিশ্বের সচেতন নাগরিক যেমন রবীন্দ্র-নজরুল-বিবেকানন্দ-সুভাষচন্দ্রকে জানেন, তেমনি তারা জেনে গেছেন ১৯৬১সালের ১৯শে মে আসামের শিলচর রেল স্টেশনে একদিনে আসাম পুলিশের গুলিতে ১১জন শহিদ হবার কথা। এই আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল আসামের অন্যতম প্রধানভাষা বাংলা যেমন স্কুলশিক্ষার মাধ্যম ছিলো,তা রাখতে হবে। বরাক অঞ্চল সহ আসামেরব সমস্ত বাঙালি প্রধান অঞ্চলের শিক্ষা ও প্রশাসনের ভাষা বাংলা রাখতে হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে আর উগ্র-অসমিয়া সংকীর্ণতাবাদী শক্তির প্রভাবে সেখানকার কংগ্রেস সরকার বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার দু-পায়ে মাড়িয়ে এই ভাষিক আক্রমণ চাপিয়ে দেয় প্রায় ৪০% বাংলা ভাষীদের ওপর। তার বিরুদ্ধে অহিংস পথে ভাষাপ্রেমীরা এই মহান আন্দোলনের ডাক দেন। বলা উচিত কোনো দল হিসেবে কোনো জাতীয় দল এই আন্দোলনে অংশ না নিলেও। বিভিন্ন দলের মাতৃভাষা প্রেমীরা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও ভাষা সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে এই আন্দোলনে যোগ দেন। পশ্চিম বঙ্গে তখন কংগ্রেস সরকার তাই বিশ্বের বৃহত্তম প্রাণ দানের এই ভাষা সংগ্রামের প্রভাব ২১শে ফেব্রুয়ারির মতো কলকাতায় ব্যাপক না হলেও কলকাতা থেকে প্রধান কিছু দৈনিকে বরাকের আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল, এছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগও ছিল। এই আন্দোলনে শহিদ হোন কমলা ভট্টাচার্য নামে এক স্কুল ছাত্রী সহ আরো দশ জন। শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, সুনীল সরকার,বীরেন্দ্র সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থ, চন্ডীচরণ সূত্রধর,সত্যেন্দ্র দেব,হীতেশ বিশ্বাস, কুমুদরঞ্জন দাস এবং তরণী দেবনাথ। ইতিহাস অধ্যয়নে আমরা জানতে পারি পরে সংগ্রামে ১৯৭২ সালের ভাষা আন্দোলনে করিমগঞ্জে প্রাণ দেন দ্বাদশ শহিদ বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু)। ১৯৮৬ সালে বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ শহরেই শহিদ হোন দিব্যেন্দু দাস ও জগন্ময় দেব শহিদ হন। আর ১৯৯৬ সালে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার সন্মান ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে করিমগঞ্জ জেলার কলকলিঘাট রেল স্টেশনে শহিদ হোন সুদেষ্ণা সিংহ। ২১শের ফেব্রুয়ারির মতো ব্যপক ভাবে আগে না পালিত হলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাতৃভাষা সমিতি ১৯৯৫ সাল থেকে সহমর্মী, ঐকতান গবেষণা পত্রের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি প্রাঙ্গনে সপ্তাহ থেকে পক্ষকাল পর্যন্ত উনিশে মে ভাষা দিবস পালন করে। ২০১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাতৃভাষা সমিতির আহবানে আয়োজিত এই ধরনের এক সর্ব ভারতীয় সম্মেলনে দুটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১) বঙ্গের বাইরের নানা মাতৃভাষা সমিতির অংশ গ্রহণে সর্ব ভারতীয় বাংলা ভাষা মঞ্চ গড়ে তোলা ২) ১৯শে মে-কে ভারতে বাংলা ভাষার অধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হবে। এই ডাক নিয়ে সর্ব ভারয়তীয় বাংলা ভাষা মঞ্চ আজও সারা দেশে ১৯শে মে পালনে করে চলেছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সকলে জানেন যে শতাব্দীর ইতিহাসে দেশে বাঙালির এতো বড় দুর্দিন আগে আর আসেনি। রবীন্দ্র- সুভাষের বাংলাভাষীকে নিশানা করে প্রান্তকায়িত করতে বাংলাদেশী বা বিদেশি বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণী নবজাগরণের বাঙালিকে “ভারতের-ইহুদি’-তে পরিণত করতে চাইছে। বিশেষ করে শোষিত প্রান্তিক বাঙালি হলেই নির্যাতন,নিধন,ডিটেনশন, ডি নাগরিকত্বের শিকার হতে হচ্ছে। কর্পোরেট বাণিজ্য প্রসারের স্বার্থে এলাকায় এলাকায় ৭০/৮০ বছরের উদ্বাস্তু , দলিত , সমতল ও পার্বত্য জনজাতি সহ বিভিন্ন প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ চলছে , যা সংবিধান বিরোধী ও ভারতের মহান অরণ্য সভ্যতার ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। উচ্ছেদ হচ্ছে গুজরাট থেকে আসাম, ওড়িশা, উত্তর প্রদেশ সহ সারা ভারতে। এ বছরের শুরুতে ওড়িশার এম ভি-২৬, মালকানগিরির গ্রামে পুলিশের সামনে তারা ১৮৫টি বাঙালি উদ্বাস্তু বাড়ি পুড়িয়ে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। সমগ্র পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে বাঙালি আক্রমণ চলছে বল্গাহীন। কেবল ভারতেই নয় আমেরিকায় বাঙালি অভিবাসী থেকে বাংলা দেশের সংখ্যালঘু মানুষ সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা ভাবে আক্রান্ত ও অধিকার হীন হচ্ছেন বাংলাভাষীরা। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাংলাভাষী বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই । ২০০৩ সালে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিক আইন সংশোধনীর নামে যে অমানবিক ও অন্যায় বিধান এনেছিল তারই পথধরে সারাদেশে বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশী বা বিদেশী বলে অপপ্রচার চলছে। অসাংবিধানিক এই অপপ্রচারের ফলে গরিব বাঙালিদের নির্যাতন, হত্যা ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে দিকে দিকে। এলিট বাঙালির একাংশের একটা ভুল ধারণা হল বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক ও বাঙালি দলিত উদ্বাস্তুদের ওপরই কেবল এ আক্রমণ সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু তপোধীর ভট্টাচার্যের ভাষায় বলি, ‘ আজ ঘুটে পুড়ছে বলে গোবর (আপনি) হাসতে পারে, কিন্তু কাল আপনার ভাগ্য অস্তমিত হবে।’ —এ যে কত বড় সত্য ইতিহাসের তার নজির হিটলারের ইহুদি নিধন থেকে আজকের ভারতের রাজ্যে রাজ্যে সাম্প্রতিক সব বাঙালি নিধন ও নির্যাতন। এরা নাগরিক আইন ও বিদেশি-আইন, পাসপোর্ট আইন আর NRC/ NRP/SIR- এর মাধ্যমে সে আক্রমণ ধাপে ধাপে নামিয়ে আনছে নানা কৌশলে ।প্রান্তিক ছাড়িয়ে এই হামলা সকল শ্রেণীর ওপর পড়বে। মূল উদ্দেশ্য বাঙালির বড় অংশকে বেনাগরিক ঘোষণা করা । মনুবাদী- কর্পোরেট স্বার্থবাহী এ যুগে সমগ্র বাঙালিকে নমশূদ্রে পরিণত করা হবে। শাসক শ্রেণির এজেন্টরা ধর্মের মোহে নানা মিষ্টি ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির আড়ালে আইনের প্যাচে প্যাচে এক ভয়ানক নাগপাশে ফাঁসাচ্ছে ভারতের বাঙালিকে। উনিশ আমাদের প্রেরণা। ঐকবদ্ধ প্রতিরোধেই মুক্তি । আসুন আমরা এর থেকে মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করি । সংঘবদ্ধ হতে হবে । ঘরে ঘরে মাতৃভাষা রক্ষার দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। তার মধ্য থেকে আমরা আমাদের মুক্তির ও অস্তিত্ব রক্ষার উপায় সন্ধান করব । তাই আসুন আমরা যে কোনো দিন যে কোনো অঞ্চলে ১৯মে পালন করি। সংগঠন গড়ে তুলুন । শহিদ দের মহান আদর্শ প্রচার করুন। আমাদের সে শপথ আজকের অন্ধকার দুর্দিনে জাতিকে আলোর পথ দেখাক। আসুন বাঙালির ভয়ংকর এ বিপদের দিনে আমরা আমাদের ভালোবাসার বৃত্তকে আরো প্রসারিত করি। সারা ভারতে ১৯শের ঐতিহাসিক শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে যেখানে যে ভাবে সম্ভব পালন করি ,ভারতে বাংলা ভাষা রক্ষা দিবস ১৯শে মে ।












