মানস বন্দ্যোপাধ্যায়: এই মুহূর্তে বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকায় স্বাধীন বেলুচিস্তানের পতাকা উড়ছে। এলাকায় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছেন বালুচরা। পাকিস্তানের মোট আয়তনের ৪২ শতাংশ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো তাদের ” প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স ” ইতিমধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছে। এই ঘোষণার মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে বেলুচিস্তানের আনুষ্ঠানিক স্বশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম দেখার যাদের সৌভাগ্য হয়নি তারা এবার নিজ চোখে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা উদযাপন দেখবে।
গত ৭৯ বছর ধরে ” আমরা বালুচের সন্তান ” এই পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে হাসতে হাসতে জীবন দিচ্ছে বেলুচিস্তানের মুসলমান।” মা চুকে বালুচানি” ওদের জাতীয় সঙ্গীত। বালুচরা পাকিস্তানের ” পাক সার জমিন সাদবাদ ” গাইতে রাজী নয়। পাকিস্তানের জাতীয় পতাকাকে ওরা এখন আর নিজেদের পতাকা মনে করে না। ২০১৩ সালে ওরা নিজেদের পতাকার ছবিও বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার গাজা অঞ্চলের জন্য বাঙালি মুসলমান ও সেক্যুলারদের বয়কট নাটকের আজো শেষ হয়নি। বেলুচিস্তান গাজা থেকে ৯৫১ গুণ বড় হলেও আজ পর্যন্ত পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে নির্মমভাবে নিহত বালুচ মুসলমানদের জন্য বাংলাদেশের তথাকথিত আহাজারি ও আহমাদুল্লাহ ধর্মব্যাবসায়ীদের একবারের জন্য ” পাকিস্তান বয়কট” স্লোগান তুলতে দেখেছেন ? এই ভণ্ডরা গাজার মুসলমানদের জন্য মায়াকান্না করলেও একই কান্না লক্ষ লক্ষ বালুচ মুসলমানদের জন্য দেখায় না। বাংলাদেশের একাংশ মুসলিম তাই কাঠমোল্লাদের ভণ্ড মোল্লা বলেন।
বেলুচিস্তান ইতিমধ্যে তাদের জাতীয় পতাকা , জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।”বেলুচি ফালুস ” নামে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থাকে চালু করেছে। বালুচদের নেতা মীর ইয়ার বেলুচ ইতিমধ্যে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেছেন , ” বেলুচিস্তানের ৮৫ ভাগ অঞ্চল এখন বালুচদের নিয়ন্ত্রণে। সোনা ও তামার খনি সহ ১৫০ টির বেশি সক্রিয় গ্যাসক্ষেত্র ও ১ হাজার ২০০ টি কয়লাখনির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে বালুচরা। নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা হচ্ছে। বেলুচিস্তান সেনাবাহিনী , নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী মিলিয়ে ৫ লাখ সদস্যের একটি বাহিনী পাকিস্তান দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে দিতে প্রস্তুত। অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা ভর্তি ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছে তারা। মিসাইল হানা প্রতিরোধ করছে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।তাই ” রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান ” স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছেন বালুচ নেতা মীর ইয়ার বালুচ।
বেলুচিস্তান এখন থেকে পাকিস্তানের কোন প্রদেশ নয়, বেলুচিস্তান পৃথিবীর অন্য সব স্বাধীন রাষ্ট্রের মত একটি রাষ্ট্র।বালুচ যোদ্ধারা স্পষ্ট করে বলেছেন, ” পাকিস্তানের সেনাবাহিনী , নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে বেলুচের ভুমি , আকাশসীমা ও উপকূল রেখা আর ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। পাকিস্তান এই বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার না করলেও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বেলুচিস্তানের অধিকাংশ এলাকায় পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেই এটাই সত্য। পাকিস্তানীরা স্বীকার না করলেও বেলুচিস্তানের অধিকাংশ এলাকা বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা কামী মানুষের দখলে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বিভাজনের আগে বেলুচিস্তান চারটি প্রধান রাজ্য যথাক্রমে কালাত, মাকরান, লাসবেলা ও খারান একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান ছিল।১৯৪৭ সালের ১১ আগষ্ট পাকিস্তানের জিন্নাহ ও বেলুচিস্তানের শাসক” খান অব কালাত ” মীর আহমেদ ইয়ার খানের মধ্যে চুক্তিতে বেলুচিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীন হলে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ হতে অস্বীকৃতি জানায়।১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানের ৭ম বালুচ রেজিমেন্ট জোরপূর্বক বেলুচিস্তান দখল করে নেয়। এরপর ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে মীর মোহাম্মদ ইয়ার খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।এই জোরপূর্বক দখলদারিত্ব আজ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের সাধারণ জনগণ মেনে নেয়নি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের মানুষ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য হাসতে হাসতে বুকের রক্ত দিচ্ছে।১৯৪৮ , ১৯৫৮ – ১৯৫৯ , ১৯৬৩-১৯৬৯ এবং ১৯৭৩-১৯৭৭ সাল দীর্ঘ সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে বালুচ মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে।২০০০ সালের পর থেকে বেলুচিস্তানের মুক্তি আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের অসংখ্য স্বশস্ত্র সংগঠন তৈরি হয়েছে।
▪️ পাকিস্তানের অধিকাংশ খনিজ সম্পদ হচ্ছে বেলুচিস্তানে। কিন্তু বেলুচিস্তানের মানুষকে তেল , গ্যাস ও বিদ্যুৎ বঞ্চিত করে তার সবকিছুই নিয়ে যায় পাকিস্তান ও চীন। ১৯৪৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানীরা এভাবেই বাংলাদেশের ৪.৫৬ বিলিয়ন ডলার লুট করে নিয়ে গিয়েছিল।
▪️ পাকিস্তান জুড়ে চীনের ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের উপরে হচ্ছে বেলুচিস্তানে। চীন ও পাকিস্তানের সিপেক ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের প্রায় সিংহভাগ বেলুচিস্তানে। এই বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে যাবে।এত বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ হারালে চীন পাকিস্তানের ঘাড়ে বসে জোর করে হলেও নিজেদের অর্থ আদায় করবে।তাতে পাকিস্তানের পরনের পাঞ্জাবি ও পায়জামা থাকলো কি না , তা নিয়ে চীনের কোন মাথাব্যথা থাকবে না। আমেরিকা ও চীনের হাতে তুলে দেওয়া পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি ও খনিজ সম্পদ বেলুচদের দখলে। বেলুচিস্তান স্বাধীন হলে আমেরিকা ও চীন দুই দেশের নতুন স্বার্থ তৈরি হবে খনিজ সম্পদের স্বর্গ বেলুচিস্তান নিয়ে। চীনের ১ থেকে ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের উপর চীনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। খয়রাতে পাকিস্তানের উপর ভরসা করে চীন এক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোন ভুল করবে বলে মনে হয় না।
▪️সোনা , তামা ও কয়লার মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদের রয়্যালটি বেলুচিস্তানকে না দিয়ে পাকিস্তান নিয়ে যায়।
▪️ পাকিস্তানের গড় দারিদ্র্যতা যেখানে মাত্র ২৮ শতাংশ , সেখানে বেলুচিস্তানের দারিদ্রতা ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানীরা বেলুচিস্তানের মুসলমানদের সব দিক থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে।
▪️ বেলুচিস্তান প্রদেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে পাকিস্তানীরা সকল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে।
▪️ বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ মানুষকে বিশুদ্ধ জলের সুবিধা পর্যন্ত দেয় না পাকিস্তান। বেলুচিস্তানের ৭০ শতাংশ এলাকায় পাকিস্তানীরা বিদ্যুৎ পর্যন্ত দেয়নি। বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষদের কাজ না দিয়ে গদাদর ও সিপেক অঞ্চলে চীনের সাথে পাকিস্তানের অন্য অঞ্চলের বহিরাগতদের দিয়ে বেলুচদের উপর বছরের পর বছর ধরে অবিচার করছে পাকিস্তান।
▪️কয়েক হাজার বালুচ ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের নির্বিচারে পাকিস্তানীরা গুম ও হত্যা করেছে।দশ হাজার বালুচ মানুষের আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ নেই। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানীরা এসব মানুষকে নিখোঁজ করে রেখেছে।১৯৭৩-১৯৭৭ সালের পাকিস্তান ও বেলুচিস্তানের যুদ্ধে ৫,৩০০ বালুচ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাকিস্তানীরা।২০০০ সালের পর থেকে প্রায় ২০০০ বালুচ মুসলমানদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ভয়েস পর বেলুচ মিসিং পারসন্স ও লেমকিন ইনস্টিটিউট এর মতে , ” শুধুমাত্র ২০০৪ সালের পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৭০০০ থেকে ২১,০০০ বালুচ নাগরিককে গুম করে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।”কিল অ্যান্ড কিডন্যাপ’ এভাবেই বছরের পর বছর ধরে নিরীহ বালুচদের হত্যা করেছে পাকিস্তানীরা।
▪️গত কয়েক বছরে বেলুচিস্তানের হাজার হাজার নারীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে গেছে পাকিস্তানের কাউন্টার টেরোরিজম ও মিলিটারির লোকেরা। অধিকাংশ নারীর দেহ পর্যন্ত আর মেলেনি। নির্মমভাবে এসব মুসলমান নারীদের ধর্ষণ করে পাকিস্তানের মিলিটারি ক্যাম্পের টর্চার সেলে নির্মম যৌন সহিংসতা চালানো হয় । জেনোসাইড ওয়াচ এর তথ্যমতে , ” এযেন বাংলাদেশের নারীদের উপর ১৯৭১ সালে চালানো পাকিস্তানী সৈন্যদের ধর্ষণের নির্মম ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি ” । বেলুচিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় হাফ উইডো তথা অর্ধ বিধবা নারীদের দেখা মিলবে। এদের স্বামীকে অপহরণ করে পাকিস্তানের মিলিটারি নিয়ে যাওয়ার পর তারা আর ফিরেনি।
যে পাকিস্তানীরা বাংলাদেশের জামায়াত শিবির জঙ্গীদের ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল করতে চায় তাদের নিজ দেশ পাকিস্তানেই পাকিস্তানী সৈন্যদের জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তা নেই।
সাউথ এশিয়ান টেরোরিজম পোর্টাল ( SATP) এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী , ” শুধুমাত্র ২০০০ সাল থেকে বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের ৩,৫০০ নিরাপত্তা কর্মী মারা গেছে। শুধুমাত্র ২০২৫ সালে মাত্র এক বছরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ১,২২৯ জন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সদস্য মারা গেছে। ২০২৬ সালেও বেলুচিস্তানে ৮০০ এর অধিক পাকিস্তানী সেনাবাহিনী মারা গেছে।এরপরও পাকিস্তানীদের নূন্যতম লজ্জা নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের পরও পাকিস্তানীরা প্রচার করার চেষ্টা করে ” জিত গয়া”।
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী “অপারেশন শাবান” এর নাম করে নির্বিচারে বালুচ নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের মাত্র দুই মাস পর থেকে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লড়াই এখনও চলছে। জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বালুচরা। পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বেলুচিস্তান এর প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষ। “জীবন দেব , কিন্তু বেলুচিস্তান দিবো না ” এমন মানুষদের হারানোর শক্তি পৃথিবীর কারোই নেই। আজ নয়তো কাল বেলুচিস্তানের ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তাদের বিজয়ের পতাকা উড়াবেই। দিল্লির মুখের দিকে চেয়ে রয়েছেন, বালুচ নেতারা। দিল্লিতে শীর্ষ স্তরে আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে ভারত সম্ভবত আফগানিস্তান ও ভুটানকে দিয়ে নতুন দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ভারত স্বীকৃতি দেবে।
লেখক: প্রেস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার সহ-সভাপতি












