,

কর্মে নিষ্ঠাবান, সেবায় অক্লান্ত, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক: শিলচরে উদযাপিত হলো ঈশ্বরলাল উবাদিয়ার জীবন ও গ্রন্থের জয়যাত্রা

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : একজন মানুষ যখন কর্ম, সেবা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে গেঁথে জীবনের মালা গাঁথেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের অনুপ্রেরণা। তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরলাল ভূদরভাই উবাদিয়া। চা-বাগানের সবুজ গালিচা থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতির সোনালি মঞ্চ— সর্বত্র তাঁর সোনার পরশ। জীবনের প্রতিটি বাঁকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প নিয়েই রচিত হয়েছে তাঁর…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন : একজন মানুষ যখন কর্ম, সেবা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে গেঁথে জীবনের মালা গাঁথেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের অনুপ্রেরণা। তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরলাল ভূদরভাই উবাদিয়া। চা-বাগানের সবুজ গালিচা থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতির সোনালি মঞ্চ— সর্বত্র তাঁর সোনার পরশ। জীবনের প্রতিটি বাঁকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প নিয়েই রচিত হয়েছে তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘মাই এক্সপিরিয়েন্স অ্যাজ অ্যা প্ল্যান্টার’। শুক্রবার শিলচর সদরঘাটের এক অভিজাত হোটেলে সেই গ্রন্থের বর্ণাঢ্য উন্মোচনী অনুষ্ঠানে ঈশ্বরভাইয়ের কর্মময় জীবন, সমাজচেতনা ও সংস্কৃতিপ্রীতির ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন বরাক উপত্যকার বিশিষ্টজনেরা।

বই প্রকাশের গুরুত্ব ও উপাচার্যের বক্তব্য: অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রাজীবমোহন পন্থ তাঁর ভাষণে বলেন, যেকোনও বই লিখে তা প্রকাশ করার গুরুত্ব অপরিসীম। লেখালেখির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা যখন নথিবদ্ধ হয়, তখন তা কালের সীমানা পেরিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। নথিবদ্ধকরণের জন্য লেখালেখি অত্যন্ত জরুরি।

চা-চাষি থেকে সমাজকর্মী ও সংস্কৃতির সাধক: ঈশ্বরভাইয়ের বহুমুখী প্রতিভার প্রশংসা করে উপাচার্য বলেন, ঈশ্বরভাই কেবল একজন সফল চা-চাষিই নন। তিনি একাধারে দূরদর্শী উদ্যোক্তা, সৃষ্টিশীল উদ্ভাবক, নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী এবং সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সাধক। তাঁর কাছে কর্মই ধর্ম, সেবাই ঈশ্বর-আরাধনা।

সাহিত্য-সংস্কৃতির নীরব পৃষ্ঠপোষক: সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ঈশ্বরভাইয়ের গভীর অনুরাগের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক পন্থ বলেন, তিনি সব সময় সাহিত্য-সংস্কৃতির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁর নীরব সহযোগিতা, উদার পৃষ্ঠপোষকতা আর আন্তরিক ভালোবাসায় শহরের অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংস্থা আজও তাদের কর্মকাণ্ড সগৌরবে চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। বহু নবীন শিল্পী তাঁর উৎসাহে মঞ্চে পা রেখেছে। লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে, শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের চর্চাকে এগিয়ে নিতে তিনি সর্বদা প্রসারিত করেছেন সাহায্যের হাত। উপাচার্য আরও যোগ করেন, ঈশ্বরভাই প্রমাণ করেছেন, একজন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী হয়েও সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে হয় না। বরং শিল্পের সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েই একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ গড়া সম্ভব। তাঁর জীবনই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

বৃদ্ধাশ্রম থেকে গোশালা— সেবার বিস্তৃত পরিধি: চা বাগানের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর সেবার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম থেকে গোশালা পর্যন্ত। অসহায়, নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মুখে হাসি ফোটানো, অবলা জীবের সেবা করা, দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীর পাশে দাঁড়ানো— এই সব মহৎ কাজে তিনি নিজেকে নিঃশব্দে উৎসর্গ করেছেন। কোনও প্রচারের আলো তাঁকে স্পর্শ করে না, তিনি কাজ করেন হৃদয়ের তাগিদে। উপাচার্য দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনেও ঈশ্বরভাইয়ের এই সেবাব্রত ও সংস্কৃতিপ্রীতি একইভাবে অব্যাহত থাকবে এবং আরও বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।

ভবিষ্যতের জন্য এক অমূল্য দলিল: অধ্যাপক পন্থ বলেন, কয়েক দশকের ঘাম-ঝরানো ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ঈশ্বরভাইয়ের এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে চা-চাষি, কৃষি-গবেষক, অর্থনীতিবিদ, অসমের জনগণ এবং সমগ্র দেশের জন্য একটি অমূল্য দলিল ও পথনির্দেশিকা হয়ে থাকবে।

চা শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাইলফলক: বইটির প্রকাশক বীরেন্দ্র জৈনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চা শিল্পের প্রতিটি স্তরের ঘাত-প্রতিঘাত, সাফল্য-ব্যর্থতার বাস্তব অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই প্রকাশনাটি একটি মাইলফলক।

বরাক উপত্যকার চা শিল্প ও সম্ভাবনা: বরাক উপত্যকার চা শিল্প প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, বিশ্বায়নের যুগে নানা প্রতিকূলতা, জলবায়ুর খামখেয়ালি আর আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এই শিল্পের শিকড় অত্যন্ত গভীর এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়। ঈশ্বরভাইয়ের মতো অদম্য কর্মবীর, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের হাত ধরেই এই শিল্প নতুন দিগন্ত স্পর্শ করবে।

পঞ্চপ্রদীপ প্রজ্বলন ও গ্রন্থ উন্মোচন: এদিন পঞ্চপ্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। গ্রন্থটির উন্মোচন করেন উপাচার্য অধ্যাপক রাজীবমোহন পন্থ, এনআইটি শিলচরের ডিরেক্টর দিলীপ কুমার বৈদ্য, অনুষ্ঠানের সভাপতি তথা বিশিষ্ট সমাজসেবী বিআর টুসনিয়াল, প্রকাশক বীরেন্দ্র জৈনসহ অন্যান্য বিশিষ্টজন।

রামরাজপুর থেকে অসমের চা বাগান— এক জীবনসংগ্রামের মহাকাব্য: উপস্থিত অতিথিরা লেখকের দীর্ঘ কর্মজীবন, অদম্য জেদ, স্বচ্ছতা, সততা এবং সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ দায়বদ্ধতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। গ্রন্থটিতে গুজরাটের ছোট্ট গ্রাম রামরাজপুর থেকে যাত্রা শুরু করে অসমের সবুজ চা বাগান পর্যন্ত ঈশ্বরলাল উবাদিয়ার জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, কঠিন সংগ্রাম, অবিচল কর্মনিষ্ঠা এবং চা শিল্পের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলার কথা অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিধৃত হয়েছে। বক্তারা বলেন, এটি নিছক ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং শ্রম, অধ্যবসায়, সততা, মূল্যবোধ ও জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য। এই গ্রন্থ তরুণ প্রজন্মকে শেখাবে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করে সততা ও নিষ্ঠার জোরে শিখরে পৌঁছাতে হয়। কীভাবে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায়।

লেখকের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া: নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে লেখক ঈশ্বরভাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গুজরাটের রামরাজপুর থেকে যাত্রা শুরু করে ভাগ্য আমাকে অসমের চা বাগানে নিয়ে এসেছিল। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন, নিঃশর্ত ভালোবাসা ও সহযোগিতা ছাড়া এই পথচলা সম্ভব হতো না। তরুণ বয়সে কাছাড়ের বাগানে কর্মজীবন শুরু করে আমি অসাধারণ পরামর্শদাতা, সহকর্মী, শ্রমিক ভাই-বোন ও বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্য পেয়েছি। তাঁদের কাছ থেকে শেখা প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। সেই অভিজ্ঞতার ভান্ডারই আজ এই বইয়ের রূপ নিয়েছে।

বিশিষ্টজনদের বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন: অনুষ্ঠানে গ্রন্থের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোকপাত করেন সিদ্ধার্থ ঘোষ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের সুরমা ভ্যালি ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান মহেশ সিং ও প্রকাশক বীরেন্দ্র জৈন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের অ্যাডিশনাল ভাইস চেয়ারম্যান খাঙ্গার জেদন।

পাঠক সমাজে সমাদৃত হওয়ার প্রত্যাশা: প্রত্যেক বক্তাই দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন, ঈশ্বরভাইয়ের জীবনদর্শন, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এই বইটি পাঠক সমাজে বিপুলভাবে সমাদৃত হবে এবং আগামী দিনের উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *