‘Forever Zubeen – Through Melodies, Words & Colours’-এ উন্মোচিত হল ‘মাতামার রাহালিং জুবিন গাৰ্গ’-এর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অনুবাদ
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : ১০৮টি প্রদীপের আলো, গাছের ছায়ায় মুক্ত আকাশের নিচে জুবিন গাৰ্গের কালজয়ী গান ‘মায়াবিনী’র সুর এবং স্মৃতি-আবেগে ভরা এক অনন্য সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল গুয়াহাটি। সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা ও স্মৃতির মেলবন্ধনে ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে, আরোহণ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং গুৱাহাটী আর্টিষ্টস’ গিল্ডের অনুপ্রেরণায় আয়োজিত হল ‘Forever Zubeen – Through Melodies, Words & Colours’। কিংবদন্তি শিল্পী জুবিন গাৰ্গের জীবন, সঙ্গীত ও সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকারকে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্য দিয়ে স্মরণ ও উদযাপন করাই ছিল এই বিশেষ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই মুক্ত আঙ্গিনায় একটি গাছের নিচে ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়। প্রদীপের আলোয় জুবিনের স্মৃতিকে সামনে রেখে পরিবেশিত হয় তাঁর জনপ্রিয় গান ‘মায়াবিনী’। সুর ও আলোর এই আবহে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জুবিন-অনুরাগীদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর আবেগঘন পরিবেশ। জুবিনের গান ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করার এই মুহূর্ত হয়ে ওঠে সন্ধ্যার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ।
অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণে ব্যতিক্রম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড. সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “জুবিনকে মনে রাখার জন্য শুধু তাঁর গান শোনা যথেষ্ট নয়, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর চিন্তা ও তাঁর সময়কে ধরে রাখাও প্রয়োজন। একজন শিল্পীকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হল বই। তাই জুবিনকে নিয়ে লেখা এবং তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণ করা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বই শুধু একজন মানুষকে নিয়ে লেখা কিছু পৃষ্ঠা নয়, তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের দলিল। জুবিনের ক্ষেত্রেও এই বই তাঁর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য স্মৃতি, অনুভূতি ও মানুষের ভালোবাসাকে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেবে।”
তিনি আরও বলেন, “জুবিন আমাদের কাছে শুধুমাত্র একজন গায়ক বা শিল্পী ছিলেন না। তাঁর কণ্ঠের মধ্যে যেমন অসমের মাটি, মানুষের জীবন ও আবেগ ছিল, তেমনই তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ছিল সীমা অতিক্রম করার এক অসাধারণ ক্ষমতা। আজ তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের কষ্ট দেয়, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর সৃষ্টি এবং তাঁকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা তাঁকে প্রতিদিন আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনে। সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।”
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী মনীষা হাজৰিকা, আরোহণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ড. সীমা কাশ্যপ, সমাজসেবী অনুরা বৈশ্য, রায়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ডাইরেক্টর কাশীপদ দাস, লেখক ড. লক্ষ্মীন্দ্র কুমার সিংহ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও লেখক গোপাল জালান, বিশিষ্ট শিল্পী শশীকান্ত সিংহ এবং ব্যতিক্রম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড. সৌমেন ভারতীয়া প্রমুখ।
এরপর অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান পর্ব হিসেবে উন্মোচিত হয় ড. সীমা কাশ্যপ রচিত ‘মাতামার রাহালিং জুবিন গাৰ্গ’-এর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অনুবাদ। গ্রন্থটির মূল রচনা অসমিয়া ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পর হিন্দি ও ইংরেজি ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছে। এবার ড. লক্ষ্মীন্দ্র কুমার সিংহের অনুবাদে গ্রন্থটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছল।
গ্রন্থ উন্মোচনের পর ড. সীমা কাশ্যপ বলেন, “জুবিনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহু দিনের। তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাঁর সৃষ্টির নানা দিক অনুভব করেছি। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্মৃতির জায়গা থেকেই প্রথমে অসমিয়া ভাষায় জুবিনকে নিয়ে এই বইটি লিখেছিলাম। পরবর্তীতে বইটি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এবার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় বইটি প্রকাশিত হওয়া আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দ ও আবেগের বিষয়। একজন শিল্পীকে শুধু একটি ভাষার মধ্যে আটকে রাখা যায় না। জুবিনের গান যেমন ভাষার সীমা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছে, তেমনই তাঁকে নিয়ে লেখা এই বইটিও বিভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছাক—এটাই আমার ইচ্ছা। ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে এই গ্রন্থ উন্মোচন হওয়ায় আমি বিশেষভাবে আনন্দিত। জুবিনকে ভালোবাসেন এমন মানুষের কাছে তাঁর স্মৃতি, তাঁর জীবন ও তাঁর সৃষ্টির নানা অধ্যায় পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমি আশা করি।”
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় গ্রন্থটির অনুবাদক ড. লক্ষ্মীন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, “জুবিন গাৰ্গের সৃষ্টির প্রতি মানুষের যে গভীর ভালোবাসা, তা কোনও একটি ভাষা বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় এই বইটি অনুবাদ করার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে একদিকে যেমন সম্মানের, অন্যদিকে তেমনই একটি দায়িত্বের বিষয়। অনুবাদের মাধ্যমে শুধু শব্দের পরিবর্তন হয় না, একটি মানুষের জীবন, অনুভূতি ও সৃষ্টির সঙ্গে অন্য একটি ভাষাভাষী সমাজের সংযোগ তৈরি হয়। জুবিনের জীবন ও সৃষ্টির এই গল্প আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে—এটাই এই অনুবাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী মনীষা হাজৰিকা জুবিনকে স্মরণ করে বলেন, “জুবিনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর গান শুনলে শুধু একটি সুর বা কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সময়, একটি অনুভূতি এবং অসংখ্য মানুষের স্মৃতি ফিরে আসে। আজ তিনি আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর গান প্রতিদিন নতুন করে তাঁকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনে। জুবিনকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আজকের এই আয়োজনের মধ্যে গান, বই, ছবি এবং মানুষের আবেগ—সবকিছু একসঙ্গে মিলেছে। জুবিন নিজেও শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমকে একসঙ্গে ধারণ করতেন। তাই তাঁকে স্মরণ করার এমন একটি আয়োজন সত্যিই অর্থবহ।”
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বও হয়ে ওঠে আবেগ ও সুরের এক বিশেষ আয়োজন। জুবিন গাৰ্গের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীত ও কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁকে স্মরণ করেন। গান পরিবেশন করেন সুমনা দে, করিশ্মা সরকার, পিঙ্কি গুপ্তা, সন্তোষী মজুমদার ও দেবযানী দে। কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন চিন্ময়ী দাস। শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানে জুবিনের গান, সুর ও সৃষ্টির স্মৃতি আরও একবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জুবিন গাৰ্গকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিশেষ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এতে ২০০-রও বেশি ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করে। জুবিন গাৰ্গের জীবন, সঙ্গীত, ব্যক্তিত্ব ও তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিকে তরুণ শিল্পীরা নিজেদের কল্পনা ও সৃজনশীলতার রঙে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে। বিভিন্ন বিভাগে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সান্ত্বনা পুরস্কারও প্রদান করা হয়।
‘এ’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে প্রিয়াণ কলিতা, দ্বিতীয় পুরস্কার দিব্যান দেয় কাশ্যপ এবং তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে স্মিরন জ্যোতি পরাশর। সান্ত্বনা পুরস্কার পায় কাত্যায়নী শর্মা।
‘বি’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে আরাধ্য দত্ত, দ্বিতীয় পুরস্কার বিকি রাজ কাশ্যপ এবং তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে নির্মল বর্মন। সান্ত্বনা পুরস্কার পায় সাজ্জাদ ইসলাম।
‘সি’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে এনি কাশ্যপ, দ্বিতীয় পুরস্কার নির্ঝুমণি বরা এবং তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে আরোহন রায়। সান্ত্বনা পুরস্কার পায় দর্শিনী কাশ্যপ।
‘ডি’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে একেলুতা বরা, দ্বিতীয় পুরস্কার শিল্পা বরা এবং তৃতীয় পুরস্কার অর্জন করে সিদ্ধি রাজজুং। সান্ত্বনা পুরস্কার পায় সিম্পি ডেকা।
জুবিন গাৰ্গের প্রতি তরুণ প্রজন্মের গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের প্রতিফলন দেখা যায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি ছবিতে। তাঁদের তুলির টানে উঠে আসে জুবিনের গান, তাঁর সৃষ্টিশীলতা এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া অমলিন স্মৃতির নানা রূপ।
সঙ্গীতের সুর, কবিতার আবেগ, বইয়ের শব্দ এবং তরুণ শিল্পীদের তুলির রঙ—সবকিছুর সম্মিলনে ‘Forever Zubeen – Through Melodies, Words & Colours’ হয়ে ওঠে জুবিন গাৰ্গের প্রতি এক বহুমাত্রিক শ্রদ্ধার্ঘ্য। ১০৮ প্রদীপের আলোয় শুরু হওয়া এই সন্ধ্যা শেষ হয় তাঁর সৃষ্টি ও স্মৃতিকে আগামী প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার এক গভীর প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে।












