কাছাড় ও বরাক উপত্যকায় একাধিক বৃহৎ প্রকল্পের অগ্রগতির খতিয়ান পেশ, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন
জনসংযোগ। শিলচর : দেশ গঠনের কাজে প্রত্যেক নাগরিককে সমান ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে খাদ্য, গণবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক, আবাসন ও নগরোন্নয়ন এবং সমবায় মন্ত্রী কৌশিক রায় শনিবার বলেন, “একটি শক্তিশালী ভারত, সমৃদ্ধ অসম এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ” গড়ে তুলতে সকলকে সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে। দেশজুড়ে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কাছাড়েও এ দিন দেশাত্মবোধ ও উৎসাহের সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়।
শিলচরের জেলা ক্রীড়া সংস্থার ময়দানে প্রধান অতিথি হিসেবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মন্ত্রী কৌশিক রায় মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে অসমের উন্নয়নের যাত্রাপথের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি কাছাড় তথা বৃহত্তর বরাক উপত্যকায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বিনিয়োগ এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিস্তৃত খতিয়ানও তিনি তুলে ধরেন।

কাছাড় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে জেলার শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিক, বিভিন্ন দফতরের প্রতিনিধি, পড়ুয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পতাকা উত্তোলনের পর মন্ত্রী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং সমবেত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন।
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মন্ত্রী কৌশিক রায় স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ় সংকল্পের ফলেই ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু-সহ অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহিদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মণিরাম দেওয়ান, কুশল কোঁৱৰ, পিয়ালি ফুকন, মুকুন্দ কাকতি, কনকলতা বড়ুয়া, ভোগেশ্বরী ফুকননী, উল্লাসকর দত্ত, কামিনী কুমার চন্দ এবং বীর শম্ভুধর ফাংলো।
স্বাধীনতার পর ভারতের ৮০ বছরের যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের অগ্রগতি আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং দেশ গঠনের এক অবিচ্ছিন্ন কাহিনি। ভারত একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভর, সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও বৃহত্তর দিশা দেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী রায় বলেন, দেশের সর্বত্র মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এই অভিযান শুধুমাত্র একটি কর্মসূচি নয়, বরং দেশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর চেতনার প্রতি আস্থার প্রতীক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অসমের উন্নয়নের যাত্রাপথ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি, পরিকাঠামো, শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি যুবসমাজের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে রাজ্য সরকার নিরন্তর কাজ করে চলেছে। অসমের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রাজ্যকে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রী রায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন পরপর দ্বিতীয় সরকার অসমে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আগের মেয়াদে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়ন জনসাধারণের সরকারের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে। অসমের উন্নয়নের যাত্রায় ‘ঐতিহ্য ও অগ্রগতি’ দুই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর রাজ্য সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়নের ভাবনা শুধুমাত্র বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হল সমাজের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের জীবনেও বাস্তব পরিবর্তন পৌঁছে দেওয়া। বিভিন্ন জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষক, শ্রমিক, মহিলা, যুবসমাজ, চা-জনগোষ্ঠী, জনজাতি সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অংশকে উন্নয়নের মূল স্রোতে নিয়ে আসা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে অসমের সামনে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমস্যা ও মোকাবিলার কথাও মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন। বিশেষ করে উচ্চ অসমের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যার পরেও মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মার নির্দেশনায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চালানো হয়েছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে বাজেট অধিবেশনের পর উন্নয়নমূলক কাজ ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা হয়েছে, যা সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রতি অঙ্গীকারকে আরও একবার স্পষ্ট করেছে।
রাজ্য সরকারের বৃহত্তর সাফল্যের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী রায় বলেন, প্রশাসন, পরিকাঠামো, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে অসম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে এক লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ১.৬৪ লক্ষ নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আরও দুই লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিভাগের বিভিন্ন সংস্কারের কথাও মন্ত্রী তুলে ধরেন। এর মধ্যে পুলিশ ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং কারা প্রশাসনের উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। নতুন ফৌজদারি আইন বাস্তবায়নে রাজ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে বলে তিনি জানান। প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে অপরাধ, বিচারাধীন মামলা এবং তদন্তের চাপ কমার পাশাপাশি দোষী সাব্যস্তের হারও উন্নত হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং মাদক উদ্ধারের মাধ্যমে আরও জোরদার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
কাছাড়ের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। শিলচরে নতুন জেলা কমিশনারের কার্যালয়ের নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে শিলচরের নতুন সার্কিট হাউসের কাজও সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে। ৬২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ শ্রীভূমি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের কাজ ইতিমধ্যে ২৮ শতাংশ এগিয়েছে। লক্ষীপুর ও ধলাইয়ে মডেল ডিগ্রি কলেজের কাজ আগামী মার্চের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এবং পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে সেখানে পঠনপাঠন শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, কাছাড়ের জেলা গ্রন্থাগার ভবন ও অডিটোরিয়ামের কাজ চলতি বছরের মধ্যেই শেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত পাঁচ বছরে কাছাড়ে ইতিমধ্যে ১০টি চা-বাগান মডেল স্কুল নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি বিদ্যালয়ের জন্য ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার ৩২টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। জেলার চা-বাগান এলাকায় ৪৫টি জগন্নাথ কমিউনিটি সেন্টার-কাম-স্কিল সেন্টার নির্মাণের কাজও শেষের পথে। সড়ক পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে মন্ত্রী রায় বহু প্রতীক্ষিত শিলচর ট্রাঙ্ক রোড–ক্যাপিটাল পয়েন্ট–রাঙ্গিরখাড়ি ফ্লাইওভার প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। ৬৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতিমধ্যে পাইল পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে এবং শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত তারাপুর–শিববাড়ি রোডের সিঙ্কিং জোনের কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
বীরবল বাজার থেকে মেডিক্যাল কলেজ রোড পর্যন্ত প্রস্তাবিত ১,৯০০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষের পথে। ক্যাপিটাল পয়েন্ট–রাঙ্গিরখাড়ি সড়কের জন্য প্রায় ৫.৫০ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, গত পাঁচ বছরে কাছাড়ে মুখ্যমন্ত্রী পকী পথ নির্মাণ আঁচনি, মুখ্যমন্ত্রী উন্নত পকী পথ আঁচনি, SOPD এবং RIDF-এর আওতায় মোট ২,১২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১,৪৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৮২৮ কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এছাড়া অসম মালা ১, ২ ও ৩-এর অধীনে আরও ৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসঙ্গে মন্ত্রী রায় বরাপানি–শিলচর হাই স্পিড এক্সপ্রেস হাইওয়ে-র কথা উল্লেখ করেন। ২২,৮৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বৃহৎ প্রকল্পকে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। গত ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন এবং চারটি প্যাকেজের টেন্ডার প্রক্রিয়াও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শীঘ্রই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, ৬,৭২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ শিলচর–চুরাইবাড়ি চার লেন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ৯৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শিলচর–জিরিবাম প্যাকেজ-১-এর কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ এগিয়েছে। অন্যদিকে ১,৯৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শিলচর–ভাইরাংটিতে চার লেন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী মার্চের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোও মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নির্মীয়মাণ ৫০০ শয্যার ইমার্জেন্সি হাসপাতাল-এর কাজ শেষের পথে। মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, শিলচর মেডিক্যাল কলেজের নিউরো সার্জারি বিভাগের জন্য মডুলার OT নির্মাণের কাজও শেষের পথে। শিলচর সিভিল হাসপাতালে ৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক এবং লক্ষীপুরে ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে। লক্ষীপুর হাসপাতালের পরিষেবা ২০২৭ সালের মধ্যে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন সূচকে অসমের উন্নতির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী রায় জানান, ২০০৪–২০০৬ সালে অসমে মাতৃমৃত্যুর হার ৪৮০ থাকলেও ২০২২–২০২৪ সালে তা কমে ৮৪ হয়েছে। এর ফলে প্রথমবারের মতো অসমের মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের নীচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে শিশুমৃত্যুর হারও কমে ২৯ হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মন্ত্রী কৌশিক রায় মুখ্যমন্ত্রী নিজুত মইনা এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজুত বাবু-সহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পড়ুয়াদের আর্থিক সহায়তার কথা তুলে ধরেন। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, ফি মকুব, স্কুটার, সাইকেল এবং ইউনিফর্ম দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। কাছাড় জেলায় ৩৮৬টি মডেল অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র অনুমোদিত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নগরোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের জন্য রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। এর মধ্যে গুয়াহাটি স্যাটেলাইট সিটি প্রকল্প এবং শিলচরে একটি আধুনিক কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। শিলচরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এবং উপযুক্ত গ্রেডিয়েন্টের ভিত্তিতে মাস্টার ড্রেনেজ প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান। নিউ শিলচরে পার্ক ও টাউন হল এবং শিলচর শ্মশানঘাটে একটি বৈদ্যুতিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মন্ত্রী রায় জানান, প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা-র অধীনে ৭০ লক্ষ রেশন কার্ডের মাধ্যমে ২.৪৮ কোটি উপভোক্তাকে প্রতি মাসে মাথাপিছু পাঁচ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। অসমের পরিবারগুলিকে ভর্তুকিযুক্ত মূল্যে অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি উপভোক্তা তালিকা যুক্তিসঙ্গত করার এবং যোগ্য নতুন উপভোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কৃষিক্ষেত্রে ধান সংগ্রহে অসমের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০২৫–২৬ মরশুমে রেকর্ড ৮.৫ লক্ষ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। কৃষকদের কেন্দ্রীয় ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (MSP) উপর প্রতি কুইন্টালে অতিরিক্ত ২০০ টাকা দিচ্ছে রাজ্য সরকার। কাছাড়ে প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি-র ২৩তম কিস্তিতে ৬৮,৯৮৯ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৫৫,০০০টি সয়েল হেলথ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
জল জীবন মিশন-এর আওতায় কাছাড়ে ১,৪৭৭টি জল সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩,৪৬,২২০টি পরিবারে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজ্যস্তরেও গ্রামীণ পরিবারগুলিতে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মিশন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মন্ত্রী জানান।
গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে মন্ত্রী রায় গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা নতুন কাঠামোর অধীনে নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সময়সীমা ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৬ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-র আওতায় অসমে ২২.৮৪ লক্ষ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। কাছাড়ে ১,৪৭,১৬০টি বাড়ি অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১,১২,২৩৭টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে।
১৫তম অর্থ কমিশন-এর আওতায় কাছাড় জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পঞ্চায়েত এবং গাঁও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ২৬৩ কোটি টাকা অনুমোদিত অর্থে ১২,২৯৮টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮,৫৫০টি প্রকল্প ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মহিলা উদ্যমিতা অভিযান-এর আওতায় মহিলাদের ক্ষমতায়নের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও মন্ত্রী তুলে ধরেন। এই প্রকল্পে কাছাড়ের ১,২৬,২৩৪ জন মহিলা উপকৃত হয়েছেন। অরুণোদয় ৩.০-এর আওতায় জেলায় ১,৮৫,৫১৮ জন মহিলাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
অসমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার প্রসঙ্গে মন্ত্রী কৌশিক রায় জানান, অ্যাডভান্টেজ অসম ২.০-এর সময় ৫.১৮ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান এবং এগুলির মাধ্যমে দুই লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাগিরোডে টাটা সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পকে অসমের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় অনুঘটক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বেকার যুবকদের আত্মনির্ভর করে তুলতে CMAAA-এর আওতায় আর্থিক সহায়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
চা-উৎপাদনকারী জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, চা-বাগান শ্রমিকদের জমির অধিকার প্রদানের প্রক্রিয়া রাজ্য সরকার শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে প্রায় ৩০,০০০ চা-শ্রমিককে জমির পট্টা দেওয়া হয়েছে। বসুন্ধরা মিশন-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে সাড়ে ৩ লক্ষেরও বেশি পরিবারকে জমির মালিকানা অধিকার দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে বসুন্ধরা ৪.০-এর প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রী বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের কথাও উল্লেখ করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে গঠিত এই বিভাগ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি বিভাগের সাথে সমন্বয় রেখে কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দির উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। সমগ্র অঞ্চলের উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত করাই এই দফতরের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
অসমে সমবায় ক্ষেত্রের সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, রাজ্যে বর্তমানে ১২,৮০০-এরও বেশি সমবায় সমিতি রয়েছে এবং সদস্য সংখ্যা ৩৪ লক্ষেরও বেশি। নতুন বহুমুখী কৃষি, দুগ্ধ এবং মৎস্য সমবায় গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। রাজ্যে দুধ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং পুরবী ডেয়ারি ইতিমধ্যে নিয়মিত প্রায় ২.৪৩ লক্ষ লিটার দুধ সংগ্রহ করছে বলে তিনি জানান।
বরাক উপত্যকার প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, সরকারের মধ্যে বরাক উপত্যকার একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাছাড় এবং সমগ্র বরাক উপত্যকার উন্নয়নই তাঁর প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন এবং অঞ্চলের ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকারও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করার জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মন্ত্রী। এই সম্মান সমগ্র বরাক উপত্যকার জন্য গর্বের বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভাষণের শেষপর্বে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশের মানুষ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকার পেয়েছেন। তাঁদের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানোর সর্বোত্তম পথ হল প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখা।
তিনি জনগণের প্রতি সম্মিলিত ভাবে “একটি শক্তিশালী ভারত, সমৃদ্ধ অসম এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ” গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণের আহ্বান জানান। উন্নয়ন কখনও স্থির থাকতে পারে না এবং ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য সকল নাগরিকের সম্মিলিত সংকল্প ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলেও তিনি জোর দেন। আগামী প্রজন্মের জন্য আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে দিনের শুরুতে মন্ত্রী কৌশিক রায়, কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা এবং কাছাড়ের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ পার্থ প্রতিম দাস, আই পি এস-কে সঙ্গে নিয়ে গান্ধীবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধে যান এবং শহিদদের স্মৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন।
এদিকে, কাছাড়ের দুইটি সম জেলাতেও এদিন সমান উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। লক্ষীপুর সম জেলা আয়ুক্ত ধ্রুবজ্যোতি পাঠক, এসিএস আরল এইচএস স্কুল মাঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। অন্যদিকে, ধলাই সম জেলা আয়ুক্ত রক্তিম বড়ুয়া, এসিএস পিডব্লিউডি
মাঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন।
শিলচরে স্বাধীনতা দিবসের উৎসবমুখর আবহে আরও একটি আকর্ষণ যোগ হয় বিকেলে। ডিএসএ গ্রাউন্ডে কাছাড় জেলা প্রশাসন একাদশ এবং কাছাড় জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন একাদশের মধ্যে একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ এই ফুটবল ম্যাচে কাছাড় জেলা প্রশাসন একাদশ ২–১ গোলে জয়ী হয়। জাতীয় দিবসের উদ্যাপনে প্রশাসন ও আইনজীবী মহলের সদস্যদের এক ক্রীড়ামূলক আয়োজনের মাধ্যমে একত্রিত করে এই ম্যাচটি বিশেষ মাত্রা যোগ করে।












