বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শান্তিনিকেতন: বরাক উপত্যকা ও শান্তিনিকেতনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে এবং বরাকের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে শান্তিনিকেতনের আঙিনায় বরাক শীর্ষক এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক মিলন উৎসব অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ৩ অক্টোবর। বোলপুর পৌরসভা হলে বিকাল ৫টায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও অতিথি বরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন হয়। এই মহতী অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক ছিল শিলচরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন শিলচর ইয়ুথ কয়্যার এবং সহযোগিতায় ছিল শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘শঙ্করা’ ও সাউথ কলকাতা সিলেট এসোসিয়েশন।

অনুষ্ঠানে দর্শক সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো, বোলপুর, শান্তিনিকেতন, কলকাতা, নদীয়া ও বরাক উপত্যকার শিলচর, কাটলিছড়া থেকে আগত অসংখ্য সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের উপস্থিতিতে পৌরসভা হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আয়োজক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও বরাককণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ চন্দ তাঁর বক্তব্যে জানান, বরাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতি যেমন ধামাইল, ভাটিয়ালি, বাউল, ঝুমুর এবং শান্তিনিকেতনের রাবীন্দ্রিক ধারা, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্র নৃত্যকে একই মঞ্চে মেলবন্ধন ঘটিয়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে এক আত্মিক যোগসূত্র স্থাপন করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। সমগ্র অনুষ্ঠানটি তিনটি সুনির্দিষ্ট পর্বে বিভক্ত ছিল।

উদ্বোধনী পর্বে ছিল অতিথি বরণ, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও বিশিষ্ট অতিথিদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, এই পর্বে সর্বপ্রথম ডেকে নেওয়া হয় আয়োজক কমিটির মূল উদ্যোক্তা সন্তোষ চন্দ এবং বিশ্বতোষ দেবকে। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাউথ কলকাতা সিলেট এসোসিয়েশনের সম্পাদিকা ডা: দীপ্তা দে, সঙ্গীত ভবন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক মানস ভূল, সঙ্গীত ভবন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক সুমিত বসু, দূরদর্শনের অধিকর্তা ও বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মী জয়গোপাল দত্ত, বিশিষ্ট লেখক ও সংস্কৃতি কর্মী সঞ্জয় রায়, নদীয়ার বিশিষ্ট বাউল শিল্পী পরেশ সরকার। অতিথি প্রত্যেকের হাত দিয়ে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানে সূচনা হয়।

এরপর অতিথীদের হাতে উত্তরীয় ও স্মারক তুলে দেন সন্তোষ চন্দ এবং বিশ্বতোষ দেব।গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক দীপঙ্কর কর, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সুব্রত চক্রবর্তী, সর্বভারতীয় ফেডারেশন অফ শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সভানেত্রী কৃষ্ণা দাশ, বিশিষ্ট তবলা বাদক ও শিক্ষক স্বপন কুমার দেবনাথকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংস্থা শংকরার পক্ষ থেকে এদিন শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের অধ্যাপক মানস ভূল সন্তোষ চন্দ এবং বিশ্বতোষ দেবকে উত্তরীয় এবং স্মারক তুলে দিয়ে সম্মান জানান।

দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল এই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র, এই পর্বে একক সঙ্গীতে অসাধারণ পরিবেশনা করেন শিলচরের বাপি রায়, নদীয়ার পরেশ সরকার, চয়নিকা পাল ও শান্তিনিকেতনের মানসী কুণ্ডু। একক নৃত্যে ছিল পহেলি পাল।

সমবেত সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্যে অংশগ্রহণ করে দর্শকদের মন জয় করে নেয় শ্রীভূমি শিল্পী সংস্থা কলকাতা যার পরিচালনায় ছিলেন দীপ্তা দে, রাগেশ্রী সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় শান্তিনিকেতন যার পরিচালনায় ছিলেন শিবানন্দ গোস্বামী, শঙ্করা সাংস্কৃতিক দল শান্তিনিকেতন যার পরিচালনায় ছিলেন মৌমিতা ভূল, শ্রীময়ীর গানভাসি শান্তিনিকেতন যার পরিচালনায় ছিলেন বনানী চট্টোপাধ্যায়, সৃজন বিতান শান্তিনিকেতন যার পরিচালনায় ছিলেন সন্তু মণ্ডল, মৈতৈ জগোই শান্তিনিকেতন যার পরিচালনায় ছিলেন সুমিত বসু এবং বরাক উপত্যকা থেকে আগত শিলচর ইয়ুথ কয়্যার কাটলিছড়া যার পরিচালনায় ছিলেন ভাস্বতী রক্ষিত। আবৃত্তিতে অংশ নেন শান্তিনিকেতনের স্বস্তিকা সরকার।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি অসাধারণ দক্ষতা ও সাবলীলতার সাথে সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী গার্গী দত্ত এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্বে ছিলেন সন্তোষ চন্দ, বিশ্বতোষ দেব, মৌমিতা ভূল এবং মানস ভূল। তৃতীয় ও শেষ সমাপ্তি পর্বে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক দলের হাতে আয়োজক শিলচর ইয়ুথ কয়্যারের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক ও শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয় এবং বরাক উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণের ধামাইল নৃত্যের মনমুগ্ধকর ছন্দে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

এতে অংশগ্রহণ করেন ভাস্বতী রক্ষিত, স্নিগ্ধা দাস, মৌঝুরী ঘোষ, অর্পিতা নাথ, দিপ্তা দে, গার্গী দত্ত, বাপি রায়, মৌমিতা ভূল,রাজেশ দাস । উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথি ও দর্শকদের মতে শান্তিনিকেতনের পুণ্যভূমিতে বরাকের সংস্কৃতির এই বর্ণাঢ্য উদযাপন শুধু একটি অনুষ্ঠানই নয়, বরাক ও শান্তিনিকেতনের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল এবং ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে সকলে আশা প্রকাশ করেন।













