শিলচরে ভূপেন স্মরণে ইতিহাস গড়ল ব্যতিক্রম, সার্থক হল ড. সৌমেন ভারতীয়ার এক বছরের সাধনা
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন, শিলচর : মঞ্চে আলো নিভল। একটি স্পটলাইট পড়ল পেছনের বিশাল ক্যানভাসে সেখানে হাসছেন ভূপেন হাজারিকা। আর সামনে ১০০ জন কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, প্রবীণ শিল্পী একসঙ্গে গেয়ে উঠলেন – “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?”
গোটা শিলচর বঙ্গভবন তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে সেই গানের গুনগুন। এ দৃশ্য কোনও সাধারণ সঙ্গীত প্রতিযোগিতার নয়, এ দৃশ্য এক শতাব্দীর শ্রদ্ধার। ভারতরত্ন, সুধাকণ্ঠ ড.ভূপেন হাজারিকার ১০০তম জন্মবার্ষিকীর বর্ষব্যাপী উদযাপনের যে যাত্রা গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে শুরু হয়েছিল, তার এক আবেগঘন, বর্ণাঢ্য এবং ঐতিহাসিক সমাপ্তি হলো মঙ্গলবার শিলচরে।
আর এই ইতিহাসের কারিগর – ব্যতিক্রম গ্রুপ।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা, আর বরাকে তার প্রতিধ্বনি
এদিন সকালেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ভূপেন হাজারিকাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন – “On his 100th birth anniversary, remembering the legendary Dr. Bhupen Hazarika Ji. His voice carried the soul of Assam and the spirit of the Northeast to the entire nation… I warmly recall attending the start of his birth centenary celebrations in Guwahati last year.”
প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তাই যেন শিলচরে বাস্তব রূপ পেল সন্ধ্যায়। দিল্লির শ্রদ্ধা আর বরাকের সুর একাকার হয়ে গেল।

১৪টি বিধানসভা, ১০০০ প্রতিযোগী, এক বিশাল কর্মযজ্ঞ
এই আয়োজন ছোট ছিল না। অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক দফতরের তত্ত্বাবধানে, ব্যতিক্রম গ্রুপের মূল উদ্যোগে এবং মেরাকি অ্যাসোসিয়েটস ও নেরিম-এর সহযোগিতায় আয়োজিত ‘দক্ষিণ অসম ভূপেন্দ্র গ্র্যান্ড সঙ্গীত প্রতিযোগিতা’ ছিল দক্ষিণ অসমের সবচেয়ে বড় ভূপেন-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা।
বরাক উপত্যকার কাছাড়, শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ), হাইলাকান্দি এবং ডিমা হাসাও জেলার ১৪টি বিধানসভা এলাকা চষে বেড়িয়ে প্রতিভা খুঁজেছে ব্যতিক্রম। প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল থেকে শিলচর শহরের কলেজ – সর্বত্র অডিশন হয়েছে। ১০০০-এরও বেশি প্রতিযোগী অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে থেকে বাছাই করে ১২৬ জনকে নিয়ে হয়েছে গ্র্যান্ড ফিনালে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে ছিল মাসের পর মাস ধরে চলা নিরলস পরিকল্পনা, যোগাযোগ এবং পরিশ্রম।
আর তাই অনুষ্ঠান শেষে দর্শক থেকে অতিথি, সবার মুখে একটাই কথা – ব্যতিক্রমের এই আয়োজন সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। শিলচর এর আগে এমন সুশৃঙ্খল, এমন আবেগময় ভূপেন-স্মরণ দেখেনি।
ড.সৌমেন ভারতীয়া – যে মানুষটা ভূপেনকে বাঁচিয়ে রাখেন
এই প্রশংসার কেন্দ্রে একজন মানুষ ড.সৌমেন ভারতীয়া। ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার। গুয়াহাটির মানুষ হলেও বরাকের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান। আর ভূপেন হাজারিকার সঙ্গে তাঁর ও ব্যতিক্রমের সম্পর্ক প্রায় তিন দশকের। তিনি বলেন, “ভূপেন হাজারিকার গানকে কেবল সঙ্গীত হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির গভীরতা ধরা পড়বে না। তাঁর গানে আছে নদী, আছে মানুষ, আছে মানবতা, সম্প্রীতি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা। আজ যখন চারদিকে বিভেদের সুর, তখন ভূপেন দা-র গানই আমাদের এক করতে পারে। সেই ভাবনাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য এই আয়োজনের। নতুন প্রজন্মের কাছে ভূপেনের গান এবং তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১১ বছর আগে, ২০১৪ সালে ভূপেন হাজারিকার ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে ব্যতিক্রম গ্রুপই বাংলা লোকগানের দল দোহারকে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেছিল, যা দুই বাংলায় সাড়া ফেলেছিল। এবার তাঁর পরিকল্পনা আরও বড় – কলকাতা ও দিল্লিতেও ভূপেনের গান নিয়ে জাতীয় স্তরের কর্মশালা।
তাঁর এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, রাত জেগে প্রতিযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, স্পনসর জোগাড়, প্রশাসনিক অনুমতি সব মিলিয়ে যে সাধনা, তা এদিন সার্থক হয়েছে। উপস্থিত ভূপেন-পরিবারের সদস্য মনীষা হাজারিকা নিজে ড.ভারতীয়াকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “সৌমেন, তুমি ভূপেন দা-কে বাঁচিয়ে রেখেছ।”

দোহারকে ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক সম্মান – লোকগানে ভূপেন
অনুষ্ঠানের আরেক আবেগঘন মুহূর্ত ছিল জনপ্রিয় লোকগানের দল ‘দোহার’-কে সম্মাননা প্রদান। দোহারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজারিকা ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক সম্মান’।
দোহারের পক্ষে সম্মান গ্রহণ করেন রাজীব দাস ও তাঁর দল। রাজীব বলেন, “১৯৯৯ সালের ৭ অগাস্ট আমাদের যাত্রা শুরু। আমরা বরাকের ভাটিয়ালি, অবিভক্ত বাংলার লোকগান আর স্বদেশি বাদ্যযন্ত্রকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চেয়েছি। ২০১৬ সাল থেকে আমরা ভূপেন দা-র গানকে লোকগানের আঙ্গিকে নতুন করে গাইছি। এই সম্মান আমাদের কাছে আশীর্বাদ।” এরপর দোহার যখন ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’ গেয়ে ওঠে, তখন গোটা হল স্তব্ধ।
কারা ছিলেন এই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায়
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভূপেন হাজারিকার ভ্রাতৃবধূ তথা বিশিষ্ট শিল্পী মনীষা হাজারিকা, মেরাকি অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিনিধি সীমা শর্মা, গৌহাটি হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী সহেলি শীল সরকার, শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নন্দিনী চক্রবর্তী, প্রবীণ শিক্ষাবিদ শিবানী ধর, সমাজকর্মী জেরিনা লস্কর, মিতালি সরকার, দেবন্তীনা সিনহা, রাজবী হোসেন, অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক দফতরের জেলা আধিকারিক স্নেহাংশুশেখর রায় ও অঞ্জন পাল এবং বরাকের সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্টজনেরা।
নতুন প্রজন্মের হাতে ভূপেনের গান – বিজয়ীদের তালিকা
সবশেষে সেই মুহূর্ত, যার জন্য এক হাজার প্রতিযোগী অপেক্ষা করছিলেন। তিনটি বিভাগে পুরস্কার ঘোষণা।
ক-বিভাগ (জুনিয়র): প্রথম – রেশমী সেন, দ্বিতীয় – সৌরভ পাল, তৃতীয় – দীপায়ন দে। সান্ত্বনা পুরস্কার – আরাধ্যা রায়।
খ-বিভাগ (মিডল): প্রথম – স্বরূপ চন্দ, দ্বিতীয় – অম্বরীশ পাল, তৃতীয় – ছন্দবীণা পাল। সান্ত্বনা পুরস্কার – নন্দিনী ঘোষ ও অভিক্ষিত চক্রবর্তী।
গ-বিভাগ (সিনিয়র): প্রথম – প্রিয়াঙ্কা দে রায়, দ্বিতীয় – রাধারাণী নাথ, তৃতীয় – সুপর্ণা দাস ভট্টাচার্য। সান্ত্বনা পুরস্কার – ইমানুয়েল টোউলর ও সপ্তপর্ণা নাথ।
বিজয়ীদের হাতে ট্রফি, সার্টিফিকেট ও নগদ অর্থ তুলে দেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠান শেষ হলেও শেষ হলো না রেশ। বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের মুখে তখনও লেগে ছিল – মানুষ মানুষের জন্য। আর এখানেই ব্যতিক্রমের জয়, এখানেই ড. সৌমেন ভারতীয়ার পরিশ্রমের সার্থকতা। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর একাগ্রতা থাকলে বরাকেও এমন বিশ্বমানের আয়োজন সম্ভব, যা ভূপেন হাজারিকার মতো কিংবদন্তিকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে চিরজাগরুক করে রাখবে।












