বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। চট্টগ্রাম : অবশেষে মায়ের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে পেলেন কারাবন্দী সনাতনী নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। মায়ের মৃত্যুর খবরে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। মায়ের চিতায় আগুন দিয়ে, সৎকারের সমস্ত আচার শেষ করে বৃহস্পতিবার রাত ঠিক ৮টা ৩ মিনিটে ফের প্রিজন ভ্যানে চেপে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার সেলে ফিরে গেলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের এই মুখপাত্র।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাত ৮টা থেকে সোয়া ৮টার মধ্যেই তাঁকে কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে কোতোয়ালি থানার একটি মামলায় হাজতি আসামি হিসেবে তিনি বন্দী রয়েছেন।
যেভাবে মায়ের মৃত্যু ও প্যারোল মিলল:
বৃহস্পতিবার সকালেই হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নের শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চিন্ময়ের মা সন্ধ্যা রানী ধর। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। পুণ্ডরীক ধামেই তাঁর চিকিৎসা চলছিল।
মায়ের মৃত্যুর খবর কারাগারে পৌঁছতেই পরিবারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে জরুরি ভিত্তিতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মোট পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির অনুমতি দেন।
এরপরই কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে হাটহাজারীর মেখলে নিয়ে যাওয়া হয় চিন্ময়কে। সেখানে শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধামে মায়ের শেষকৃত্য ও সৎকারে অংশ নেন তিনি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট চিন্ময়ই মায়ের মুখাগ্নি করেন বলে জানা গেছে। শেষকৃত্য শেষে সন্ধ্যার পরপরই তাঁকে আবার কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা করানো হয়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “আমরা তাঁকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফিরিয়ে এনেছি। পুরো যাতায়াত ও সৎকার পর্ব শান্তিপূর্ণভাবে ও কঠোর নিরাপত্তায় সম্পন্ন হয়েছে।”
কে এই চিন্ময় কৃষ্ণ দাস? কেন তিনি কারাগারে?
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী হঠাৎ করে আলোচনায় আসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। সেই সময় আট দফা দাবিতে সনাতনী সম্প্রদায়ের যে বড় আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার প্রধান মুখপাত্র ছিলেন এই চিন্ময়।
এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলায় ২৫ নভেম্বর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়।
যেদিন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছিল, সেদিন চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর হাজার হাজার সমর্থক প্রিজন ভ্যান ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। সেই সংঘর্ষ চলাকালীন আদালত প্রাঙ্গণের অদূরেই নৃশংসভাবে খুন হন আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ।
বর্তমানে আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলা সহ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে মোট আটটি মামলা চলছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন, কিন্তু অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো থাকায় তাঁর কারামুক্তি আটকে রয়েছে। প্রায় ১০ মাস ধরে তিনি চট্টগ্রাম কারাগারেই বন্দী।












