বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর : শিলচর পৌরনিগম নির্বাচন। শেষ মুহূর্তের প্রচারে ঝড় তুলতে বরাক সফরে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে একাধিক হেভিওয়েট মন্ত্রী, বিধায়ক ও রাজ্য নেতৃত্ব। মঞ্চ থেকে প্রতিশ্রুতির বন্যা — শিলচরকে তিলোত্তমা করা হবে, স্মার্ট সিটি হবে, রাস্তা হবে, ড্রেন হবে, জল হবে, আলো হবে। বিজেপিকে জেতানোর জন্য বড় বড় ভাষণে ভরিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিটি ওয়ার্ড।
কিন্তু এই হাজারো প্রতিশ্রুতির ভিড়ে কোথাও উচ্চারিত হল না একটি শব্দ — সংস্কৃতি।
আর এখানেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বরাক উপত্যকার অগ্রণী সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ।
মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অজয় কুমার রায় আজ এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, “এবারের পৌর নির্বাচনের প্রচার দেখে মনে হচ্ছে, শিলচর শুধু ইট-কাঠ-পাথরের শহর। এই শহরের যে প্রাণ আছে, আত্মা আছে, ভাষা-সংস্কৃতির ইতিহাস আছে, সেটা ভুলে গেছে শাসক দল।”
তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী এলেন, মন্ত্রীরা এলেন, সবাই বরাকের উন্নয়নের জয়গান করলেন। কিন্তু বরাকের মানুষ বহু বছর ধরে যে দাবিগুলো করে আসছে, তার একটিও তাঁদের মুখে শোনা গেল না।”
কি সেই দীর্ঘদিনের দাবিগুলো?
অজয় রায় স্মরণ করিয়ে দেন, বরাকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবি —
১. শিলচর জেলা গ্রন্থাগার: একসময় জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা ধুঁকছে। তার আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশনের কোনও প্রতিশ্রুতি নেই।
২. শিলচর গান্ধী ভবন: শহরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান মঞ্চ, আজ ভগ্নপ্রায়। তার সংস্কারের কথা কেউ বললেন না।
৩. ভাষা শহীদ স্টেশন: ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নামে শিলচর রেল স্টেশনের নামকরণের দাবি বহু পুরনো। এই আবেগ নিয়ে একটি কথাও বললেন না কোনও নেতা।
৪. নিউ শিলচর এলাকায় খেলার মাঠ ও গ্রন্থাগার: নতুন প্রজন্মের জন্য একটি মাঠ এবং একটি গ্রন্থাগারের দাবি দীর্ঘদিনের, সেটিও ব্রাত্য থেকে গেল।
“প্রকৃত দেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে সংস্কৃতি চর্চা। রাস্তা-ঘাট দিয়ে শহরের শরীর তৈরি হয়, কিন্তু সংস্কৃতি দিয়ে তৈরি হয় শহরের আত্মা। সরকার শুধু শরীরের কথা বলছে, আত্মার কথা ভুলে যাচ্ছে,” — ক্ষোভের সঙ্গে বলেন অজয় রায়।
তিনি সরকারের এই নীরব ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানান। বিশেষ করে স্থানীয় মন্ত্রী ও বিধায়কদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, “মনে হচ্ছে, বরাকের প্রকৃত সাংস্কৃতিক উন্নয়ন হোক, এটা স্থানীয় শাসকগোষ্ঠীর নেতারাই চাইছেন না। তাঁরা কেন্দ্র ও রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলছেন, কিন্তু বরাকের মাটির দাবিগুলো মুখ্যমন্ত্রীর কানে তুলে ধরতেও ব্যর্থ।”
তবে হতাশ হলেও আশা ছাড়ছে না মঞ্চ। বিবৃতির শেষে বলা হয়েছে, পৌরনিগম নির্বাচনের পর নতুন বোর্ড গঠিত হলে সরকার সংস্কৃতির স্বার্থে এগিয়ে আসবে এবং এই দাবিগুলো পূরণ করবে।
আর যদি সরকার এগিয়ে না আসে? তারও উত্তর দিয়েছেন অজয় রায় — “এখন একমাত্র পথ, শহরের সাংস্কৃতিক মনস্ক বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, কলাকুশলী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই নিজেদেরই লড়তে হবে।”












