,

ব্যতিক্রম-এর উদ্যোগে জয়ন্ত হাজরিকার ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সফল সমাপ্তি

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী জয়ন্ত হাজরিকার ৮৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা, আবেগ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে উদযাপিত হল। ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার মাচখোয়ার প্রাগজ্যোতিষ আইটিএ সেন্টারে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে জয়ন্ত হাজরিকার সংগীত ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে সুর বাহিনী ও বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, গুয়াহাটি। অনুষ্ঠানে প্রধান…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী জয়ন্ত হাজরিকার ৮৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা, আবেগ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে উদযাপিত হল। ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার মাচখোয়ার প্রাগজ্যোতিষ আইটিএ সেন্টারে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে জয়ন্ত হাজরিকার সংগীত ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে সুর বাহিনী ও বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, গুয়াহাটি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সঞ্চালক রাহুল দাস, জয়ন্ত হাজরিকার পত্নী মনীষা হাজরিকা, অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি পদ্মশ্রী সূর্য হাজরিকা, প্রাক্তন এ.সি.এস. আধিকারিক কৃষা বরুয়া, বিশিষ্ট সমাজসেবক শংকরলাল গোয়েঙ্কা, জুবীন গার্গের পত্নী গরিমা শইকীয়া গার্গ, অভিনেতা কপিম বরা, বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবজিৎ ভূঞা, সংগীত শিল্পী জে.পি. দাস, সমাজ সেবক গোপাল জালান, ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা বঁটা ২০২৬’ প্রদান। সংগীত ও লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছর অরুণাচল প্রদেশের বিশিষ্ট গীতিকার, লোকশিল্পী ও সংগীতসাধক রেরিক কার্লো দিগবাককে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।

শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী রেরিক কার্লো দিগবাক ১৯৯৯ সালে ইটানগর আকাশবাণীর শিল্পী হিসেবে অনুমোদন লাভের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীকালে আকাশবাণী ও দূরদর্শন কেন্দ্র, ইটানগরে তিনি বহু স্থানীয় লোকগান রেকর্ড করেন। অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও উপভাষায় লোকসংগীত সংরক্ষণ ও প্রচারে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আদি, বোকার, আপাতানি, গালো, তাগিন, নিশি, মোনপা, মিজি, মিসিং-সহ অরুণাচলের বিভিন্ন ভাষায় তিনি লোকগান রেকর্ড করেছেন। পাশাপাশি হিন্দি ও অসমিয়া ভাষাতেও তাঁর গান রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ভাষায় তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা ৪০৬টি। গান পরিবেশনের পাশাপাশি বহু গানের রচনার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি সেগুলির দৃশ্যায়নে নৃত্যপরিকল্পনার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের জন্য দেশাত্মবোধক গান রচনা ও পরিবেশনেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।

সম্মান গ্রহণের পর রেরিক কার্লো দিগবাক বলেন, “জয়ন্ত হাজরিকার নামে এই সম্মান গ্রহণ করা আমার কাছে অত্যন্ত গর্ব ও আবেগের বিষয়। জয়ন্ত হাজরিকা শুধু অসমের একজন কিংবদন্তি শিল্পী নন, তাঁর সংগীত সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমার দীর্ঘদিনের লোকসংগীতচর্চাকে ব্যতিক্রম যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এই সম্মান আমাকে আগামী দিনেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।”

জয়ন্ত হাজরিকার পত্নী মনীষা হাজরিকা বলেন, “জয়ন্তর জন্মদিনে প্রতি বছর ব্যতিক্রম যে উদ্যোগ নেয়, তা শুধু একটি স্মরণ অনুষ্ঠান নয়, তাঁর সংগীত ও চিন্তাধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। জয়ন্ত মানুষের গান, মাটির গান এবং অসমের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রেরিক কার্লো দিগবাকের মতো একজন শিল্পীকে তাঁর নামে সম্মানিত করা জয়ন্তর সংগীতভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ব্যতিক্রমকে এই সুন্দর উদ্যোগের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।” ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “জয়ন্ত হাজরিকা আমাদের কাছে শুধু একজন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী নন, তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাঁর জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর আমরা এমন একজন শিল্পীকে সম্মানিত করার চেষ্টা করি, যাঁর দীর্ঘদিনের সাধনার মধ্যে সংগীত, লোকঐতিহ্য এবং মানুষের সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে। রেরিক কার্লো দিগবাক বহু ভাষা ও জনগোষ্ঠীর লোকসংগীত সংরক্ষণ ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে কাজ করে চলেছেন, তা অত্যন্ত মূল্যবান। তাঁর হাতে এবারের সম্মান তুলে দিতে পেরে আমরা গর্বিত। জয়ন্ত হাজরিকার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”

জয়ন্ত হাজরিকার সংগীত ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানোর এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় গত পাঁচ বছর ধরে ব্যতিক্রম-এর পক্ষ থেকে সংগীতের বিভিন্ন ধারায় দীর্ঘদিনের সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। ২০২১ সালে অসমের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী জে. পি. দাস, ২০২২ সালে কলকাতার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র, ২০২৩ সালে বড়োল্যান্ডের প্রখ্যাত শিল্পী সুলেখা বসুমতারী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী লু মাজাউ এবং ২০২৫ সালে অসমের প্রখ্যাত কার্বি লোকসংগীতশিল্পী পদ্মশ্রী পখিলা লেখথেপিকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে অরুণাচলের লোকসংগীত ও লোকঐতিহ্যের অন্যতম বিশিষ্ট সাধক রেরিক কার্লো দিগবাককে এই সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্য যোগ করে।

জয়ন্ত হাজরিকার কালজয়ী গান পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী শান্ত উজির, মালবিকা বরা, জে. পি. দাস, সন্ধ্যা মেনন, দিলীপ দাস এবং শিশু শিল্পী শাশ্বত দত্ত। নৃত্য পরিবেশন করেন সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কারপ্রাপক অনিতা শর্মা ও তাঁর সঙ্গীবৃন্দ। সংগীত ও নৃত্যের বিশেষ পরিবেশনা জয়ন্ত হাজরিকার কালজয়ী সৃষ্টির প্রতি এক আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে ওঠে। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও দর্শকদের মধ্যে জয়ন্ত হাজরিকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের প্রকাশ দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *