বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। নতুন দিল্লি : স্বাধীনতার ৮০তম বছরে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে দেশবাসীকে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার শপথ নেওয়ার ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও গার্ড অফ অনার গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি।
এর আগে রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধী ও শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। লালকেল্লায় এবারই প্রথম “বন্দে মাতরম” ধ্বনিতে মুখরিত হয় অনুষ্ঠান। পতাকা উত্তোলনের সময় বায়ুসেনার তরফে পুষ্পবৃষ্টিও করা হয়।
“ছোট স্বপ্ন দিয়ে চলবে না”
ভাষণের শুরুতেই মোদি বলেন, “আজকের ভারত নতুন স্বপ্ন দেখছে। বড় স্বপ্ন দেখার সময় এসেছে। কারণ বড় স্বপ্ন আমাদের চিন্তার পরিধিকে প্রসারিত করে।”
তিনি বলেন, গত ১২ বছরে দলিত, নির্যাতিত, প্রান্তিক, গ্রামীণ, শহুরে, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, যুবক, প্রবীণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে অটল সংকল্প নিয়ে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। “আমি এই প্রচেষ্টাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করি” – বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর কথায়, “একটা জাতি তখনই মহান হয়ে ওঠে যখন তারা স্বপ্ন, দৃঢ় সংকল্প ও নিজস্ব শক্তির তাড়নায় এগিয়ে যায়। সংকল্প দৃঢ় হলে প্রতিকূলতার মাঝেও পথ বেরিয়ে আসে।”

২০৪৭ ও গত ১২ বছরের খতিয়ান
২০৪৭ সালে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যের কথা ফের স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদি গত ১২ বছরের সাফল্যের খতিয়ান দেন।
তিনি জানান, এই সময়সীমায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। এই ১২ বছরেই ভারত দ্রুততম উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে উৎপাদন ৪ গুণ বেড়েছে। ঘরে ঘরে জল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং ডিজিটাল ক্ষেত্রে দেশ অনেক এগিয়েছে।
আত্মনির্ভর ভারত ও বিশ্ব পরিস্থিতি
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ আবহ ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মোদি আত্মনির্ভরতার উপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। বলেন, “ভারতকে আর অন্য দেশের ওপর নির্ভর করে থাকা চলবে না। নিজেদের স্বার্থ নিজেদের রক্ষা করতে হবে। এই সংকল্প নিয়ে আমরা ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছি।”
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্বদেশি’ এবং ‘লোকাল ফর লোকাল’-এর মতো উদ্যোগে প্রতিটি ভারতীয়কে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। “ছোট কলকবজা থেকে বড় পণ্য তৈরি করতে হবে। পণ্যের গুণমানে কোনও আপস নয়” – বলেন মোদি।

সেমিকন্ডাক্টর ও পরমাণু শক্তি
ডিজিটাল যুগে চিপের গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, “ইলেকট্রনিক পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা পরিবহন – সবক্ষেত্রেই চিপ অপরিহার্য। এগুলো ছাড়া বিশ্বব্যবস্থা অচল।”
তিনি বলেন, ভারত এই খাতে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়েছে। ইতিমধ্যেই ৩টি বড় সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপিত হয়েছে এবং রপ্তানির উদ্দেশ্যে উৎপাদনও শুরু হয়েছে। আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে আরও ৫ থেকে ৮টি সেমিকন্ডাক্টর কারখানা চালু হবে।
পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে তিনি জানান, ৫টি নতুন পরমাণু চুল্লি তৈরি হচ্ছে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পরমাণু শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে ভারত এগোচ্ছে।
বিরোধীদের নিশানা ও সরকারের প্রস্তুতি
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদের একহাত নেন মোদি। বলেন, “অনেকে বলছিলেন ইউক্রেনে যুদ্ধ হচ্ছে। গ্যাস পাবেন না। পেট্রল পাম্পে তেলও পাবেন না। কিছু লোকের আনন্দ হচ্ছিল দেশবাসীকে ভয় দেখিয়ে। কৃষকদের ভয় দেখানো হচ্ছে ইউরিয়া পাবেন না। কিন্তু যাতে কারও কোনও সমস্যা না হয়, সেজন্য ভারত প্রস্তুত ছিল।” করোনা থেকে জ্বালানি নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগও তোলেন তিনি।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা
রেল: মোদি বলেন, “রেলে ৯০ বছরে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিকরণ হয়েছে। আর গত ১০ বছরে ৭০ শতাংশ হয়েছে। ভারতে এখন হাইড্রোজেন ট্রেন চলছে।”
সৌরশক্তি: ‘পিএম সূর্য ঘর’ যোজনায় ৫০ লক্ষ বাড়িতে সৌরশক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে অনেকের বিদ্যুৎ বিল শূন্য হয়ে গিয়েছে।
সমুদ্র সম্পদ: সমুদ্রমন্থন প্রকল্পে ৮৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
আইন সংস্কার: দেশের পুরনো আইন বাতিল করে নতুন কর্ম সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বন্যা ও শেষ বার্তা
ভাষণের শেষে অসমের বন্যার্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, “আজ হর ঘর তিরঙ্গা। হর মন তিরঙ্গা। নতুন সংকল্প নিয়ে এগোচ্ছে দেশ।” শেষে তিনি স্পষ্ট করে দেন, “২০৪৭ সালে বিকশিত ভারত গড়ার সংকল্প অপূর্ণ থাকবে না।”












