বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি: শিলচর পৌরনিগমের ঐতিহাসিক প্রথম নির্বাচনের দামামা বেজে গেছে। শহরের অলিতে-গলিতে এখন ভোটের হাওয়া। প্রার্থীরা ঘর ঘর প্রচারে ব্যস্ত। আর ঠিক এই সময়ে শিলচর, যোরহাট ও ডিব্রুগড়—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ শহরের জন্য বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্তবিশ্ব শর্মা। তিন শহরের নগর পরিকাঠামো উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা করে মোট ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যের উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করাই সরকারের লক্ষ্য। শুধু গুয়াহাটি নয়, রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের শহরকে সমানভাবে আধুনিক, সুন্দর ও বসবাসযোগ্য করে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যেই এই বরাদ্দ। এই টাকায় রাস্তা, ড্রেন, পানীয় জল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট লাইট ও শহরের সৌন্দর্যায়নের কাজ করা হবে।

শিলচরের জন্য কেন এই ঘোষণা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
যোরহাট ও ডিব্রুগড়ের পাশাপাশি নাম থাকলেও এই ঘোষণা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক শিলচরের জন্য। কারণ, পুরসভা থেকে পৌরনিগমে উন্নীত হওয়ার পর এটাই শিলচরের প্রথম নির্বাচন। ৪২টি ওয়ার্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন পৌরনিগম।
কিন্তু শহরের পরিকাঠামোর ছবিটা এখনও করুণ। যে কোনো শিলচরবাসীকে জিজ্ঞেস করলেই একটাই অভিযোগ শুনবেন—রাস্তা। রাঙ্গিরখাড়ি, তারাপুর, মালুগ্রাম, ন্যাশনাল হাইওয়ে সংলগ্ন লিঙ্ক রোড, চার্চ রোড, বিলপার —শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় বড় বড় গর্ত। পিচ উঠে গিয়ে কোথাও কোথাও রাস্তা খালে পরিণত হয়েছে। অটো বা টোটোতে গেলে মনে হয় নৌকায় চলছেন।
তার সঙ্গে রয়েছে নিকাশির পুরনো সমস্যা। শহরের ড্রেনগুলো বহু পুরনো, সরু এবং আবর্জনায় বন্ধ। আধ ঘণ্টা মুষলধারে বৃষ্টি হলেই শহরের নিচু এলাকা—পঞ্চায়েত রোড, ন্যাশনাল হাইওয়ে, বিলপার, ঘনিয়ালা, লিংকরোড সহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুজল জমে যায়। দোকানে জল ঢোকে, স্কুল পড়ুয়াদের দুর্ভোগ হয়। পানীয় জলের পাইপ লিকেজের সমস্যাও দীর্ঘদিনের।
এই প্রেক্ষাপটে ১০০ কোটি টাকার ঘোষণা শিলচরবাসীর কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘদিনের ক্ষোভে একটু প্রলেপ।
ঘোষণার মধ্যেই নতুন বিতর্ক—ব্লকের ওপর পিচ কতদিন টিকবে?
কিন্তু এই খুশির মধ্যেই ইতিমধ্যে শহরের কয়েকটি জায়গায় যে কাজ শুরু হয়েছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ।
সম্প্রতি দেখা গেছে, শহরের বেশ কিছু রাস্তায় পুরনো ইটের ব্লক না তুলেই তার ওপর সরাসরি পিচ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। ওপর থেকে দেখতে চকচকে, নতুন রাস্তা মনে হলেও ভেতরের ভিত দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
নাগরিকদের প্রশ্ন, এভাবে রাস্তা কতদিন টিকবে? ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, ব্লকের ওপর পিচ করলে বন্ডিং ঠিক হয় না। নিচে ফাঁকা থাকে। ভারী ট্রাক, লরি চলাচল করলেই পিচ ফেটে যায়, দেবে যায়। আর বর্ষার জল সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে পুরো রাস্তাটাকে ভেতর থেকে নষ্ট করে দেয়।
শিলচরেই এর উদাহরণ আছে। গত বছরও শহরের দু-একটি ওয়ার্ডে একই পদ্ধতিতে কাজ করা হয়েছিল। তিন মাসের মধ্যে সেই রাস্তা আবার ভেঙে গর্ত হয়ে গেছে।
তাই মানুষের আশঙ্কা, যদি ১০০ কোটি টাকাও এভাবে ব্লকের ওপর পিচ ঢেলে শেষ করে দেওয়া হয়, তাহলে কয়েক মাস পরেই আবার সেই একই ছবি ফিরে আসবে। সরকারি টাকা নষ্ট হবে, কিন্তু শহরের মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। আর তার পরিণতি হবে আবার সেই পুরনো চিত্র—নাগরিক মঞ্চের আন্দোলন, পথ অবরোধ, ধর্মঘট, স্মারকলিপি—যা শিলচর বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছে।
সচেতন মহলের স্পষ্ট দাবি—টেকসই কাজ চাই
এই অবস্থায় শহরের সচেতন নাগরিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংগঠন প্রশাসনের কাছে খোলা আবেদন জানিয়েছেন—এই ১০০ কোটি টাকা যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়।
তাঁদের তিনটি স্পষ্ট দাবি রয়েছে—
প্রথমত, তাড়াহুড়ো করে ভোটের আগে দেখানোর জন্য কাজ নয়। যেখানে ব্লক রয়েছে, সেখানে ব্লক তুলে মাটি ভালো করে বসিয়ে, নতুন করে সাব-বেস তৈরি করে তারপর পিচ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাস্তার আগে ড্রেন। নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক না করে রাস্তা করলে কোনো লাভ হবে না। জল জমলে নতুন রাস্তাও কয়েক মাসে নষ্ট হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, কাজে স্বচ্ছতা ও তদারকি। টেন্ডার প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ হয়, কাজের গুণমান যেন নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় এবং কোন ঠিকাদার কী কাজ করছে তা যেন জনসমক্ষে থাকে।
ভোটের অঙ্কে কী প্রভাব পড়বে?
৪২ ওয়ার্ডের এই নির্বাচন শাসক-বিরোধী উভয়ের কাছেই প্রেস্টিজ ফাইট। বিজেপি ইতিমধ্যে ৩৮টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে, দুটি ওয়ার্ডে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে। বিরোধীরাও বেহাল রাস্তাকে প্রধান ইস্যু করেছে।
এমন সময়ে ১০০ কোটির ঘোষণা বিজেপির প্রচারে বড় অস্ত্র। তারা বলতে পারবে, সরকার টাকা দিয়েছে, উন্নয়ন হবে। কিন্তু যদি মানুষ দেখে সেই টাকায় আবার ব্লকের ওপর পিচ দিয়ে দায়সারা কাজ হচ্ছে, তাহলে তার উল্টো ফলও হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত শিলচরবাসী একটাই কথা বলছেন—আমাদের চকচকে ঘোষণা নয়, টেকসই রাস্তা চাই। ১০০ কোটি টাকা যেন শুধু ভোটের প্রতিশ্রুতি হয়ে না থাকে, তা যেন সত্যিই শিলচরের চেহারা বদলে দেয়—এটাই এখন শহরের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি।












