,

ব্যতিক্রমের উদ্যোগে গুয়াহাটিতে মঞ্চস্থ রবী ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’, দর্শকদের বিপুল সাড়া

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : ব্যতিক্রমের উদ্যোগে ৭ অক্টোবর, বুধবার গুয়াহাটিতে মঞ্চস্থ হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘নৌকাডুবি’। শিলচরের তরুণ নাট্যকর্মীদের পরিবেশনায় এই নাটক দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। শ্রী শ্রী মাধবদেব আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়, প্রতিটি দৃশ্যান্তরে করতালি এবং নাটক শেষে শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময় গোটা সন্ধ্যাকে স্মরণীয় করে তোলে। বরাক…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : ব্যতিক্রমের উদ্যোগে ৭ অক্টোবর, বুধবার গুয়াহাটিতে মঞ্চস্থ হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘নৌকাডুবি’। শিলচরের তরুণ নাট্যকর্মীদের পরিবেশনায় এই নাটক দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। শ্রী শ্রী মাধবদেব আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়, প্রতিটি দৃশ্যান্তরে করতালি এবং নাটক শেষে শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময় গোটা সন্ধ্যাকে স্মরণীয় করে তোলে। বরাক উপত্যকার নতুন প্রজন্মের নাট্যচর্চা ও সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে এই মঞ্চায়ন।

প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট অভিনেতা প্রাঞ্জল শইকীয়া, ভারত সরকারের ন্যশনাল ট্রেইনার ড. সুলেখা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট সাংবাদিক উদয়ন বিশ্বাস, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও নির্দেশক মানিক আহমেদ, অসম নাট্যসন্মিলনের সভাপতি জিতেন শর্মা, কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ পি. এস. রেড্ডি, কবি বিকাশ সরকার, আজকের প্রজন্ম সেবায়ন রায় চৌধুরী, সেভেন সেন্স কমিউনিকেশনস-এর প্রতিষ্ঠাতা শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নৌকাডুবি-র ডাইরেক্টর সায়ন বিশ্বাস, সমাজসেবী অন্তরা পাল, শিক্ষাবিদ জয়শ্রী ঘোষ, অসম সরকারের পর্যটন বিভাগের প্রাক্তন কমিশনার এবং সচিব রাজভি হুসেন, ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া সহ নাট্য, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

অনুষ্ঠানের সূচনায় রবীন্দ্রসাহিত্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড° উষারঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’ বাংলা সাহিত্যের এমন এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে মানবজীবনের জটিলতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরিচয়ের সংকট এবং ভাগ্যের বিচিত্র পরিহাস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই উপন্যাসের সাহিত্যিক গভীরতা ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে মঞ্চে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে একটি সৃজনশীল চ্যালেঞ্জ। রবীন্দ্রসাহিত্যের শক্তি এখানেই যে, সময়ের পরিবর্তনেও তার আবেদন অমলিন থাকে এবং প্রতিটি প্রজন্ম তাকে নতুন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করতে পারে। ‘নৌকাডুবি’র এই নাট্য উপস্থাপনা দর্শকদের সেই সাহিত্যিক অনুভবের কাছাকাছি পৌঁছে দেবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ধরনের উদ্যোগ রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চা ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসকে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে নির্দেশক সায়ন বিশ্বাস এবং শিলচরের নাট্যদলের শিল্পীরা তাঁদের অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আলোর ব্যবহার ও দৃশ্য বিন্যাসের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। কর্মদিবসের বিকেল পাঁচটা থেকেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। সন্ধ্যা ছয়টায় নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হলভর্তি দর্শকের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে গোটা প্রেক্ষাগৃহ। নাটকের প্রতিটি দৃশ্যান্তরে করতালি, রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে দর্শকদের কণ্ঠ মেলানো এবং গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলিতে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে।

নাটক শেষ হওয়ার পর দর্শকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক সামনে আসে। বাঙালি ও অসমিয়াভাষী দর্শকদের পাশাপাশি বড়ো, মণিপুরি, বিহারি এবং দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, ভালো নাটক ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে। নাটক শেষে তরুণ শিল্পীদের বাংলা, অসমিয়া ও হিন্দি ভাষায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দেওয়া তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও শিল্পীসত্তার বিকাশেরও পরিচয় দেয়।

বিশিষ্ট অভিনেতা প্রাঞ্জল শইকীয়া বলেন, “প্রথমেই ব্যতিক্রম ও সৌমেন ভারতীয়াকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই, গুয়াহাটিতে এমন একটি সুন্দর নাট্যসন্ধ্যার আয়োজন করার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’র এই মঞ্চায়ন শিলচর, বরাক উপত্যকা ও গুয়াহাটির সাংস্কৃতিক যোগসূত্রকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীরা যে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে নাট্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে এই প্রযোজনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে আরও বৃহত্তর দর্শকমহলের কাছে অসমের তরুণ প্রজন্মের নাট্যচর্চার পরিচয় তুলে ধরবে।”

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকের উপন্যাসকে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন সাহিত্যবোধ, সৃজনশীল নির্দেশনা এবং শিল্পীদের নিবিড় অনুশীলন। শিলচরের তরুণ নাট্যদল যেভাবে ‘নৌকাডুবি’কে মঞ্চে উপস্থাপন করেছে, তা প্রশংসনীয়। গুয়াহাটির দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া প্রমাণ করে, ভালো নাটকের আবেদন সর্বজনীন। ব্যতিক্রমের এই উদ্যোগ দুই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।”

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বিকাশ সরকার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “একটি সন্ধ্যার জন্য আমার হারিয়ে যাওয়া নাট্যকৈশোর ফিরিয়ে দিয়েছেন ব্যতিক্রমের কর্ণধার সৌমেন ভারতীয়া। বারবার মনে পড়ছিল আমাদের ভেঙে যাওয়া নাট্যদল ‘অভিমান’-এর কথা এবং সেই পাঁচটি নাটকের পাঁচ বছরের স্মৃতি। সায়ন বিশ্বাস নির্দেশিত ‘নৌকাডুবি’ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। টানটান নাট্যরূপ, মঞ্চের ত্রিভাগ বিন্যাস, মায়াবী আলোর ব্যবহার, প্রতিটি চরিত্রের অন্তরঙ্গ অভিনয় এবং অপরূপ অঙ্গসজ্জা—সব মিলিয়ে প্রযোজনাটি অসাধারণ। বহুদিন পর এমন একটি নাটক দেখলাম, যা অভিনয় শেষ হওয়ার পরও মনে দীর্ঘক্ষণ অনুরণন তোলে। সৌমেন ও সায়নকে আন্তরিক ধন্যবাদ।”

ব্যতিক্রমের কর্ণধার সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “আমার কাছে এটি অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের মুহূর্ত। ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবৰ্ষ উপলক্ষে দক্ষিণ অসমে ১৬টি স্থানে ভূপেন্দ্রসংগীতের আয়োজন করা হয়েছিল, যার পরিসমাপ্তি ঘটে এক বৃহৎ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই ধরনের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং মেলবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করা। ব্যতিক্রমের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবার নাটকের মঞ্চেও সেই সমন্বয়ের ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরে আমরা আনন্দিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’র এই অসাধারণ মঞ্চায়নে ১৬ জন শিল্পী একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত অভিনয় ও নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই প্রযোজনার মধ্য দিয়ে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আরও একবার সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গুয়াহাটির দর্শকদের ভালোবাসা ও উৎসাহ আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা চাই, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও নাটকের মাধ্যমে দুই উপত্যকার মানুষের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকুক।”

এই মঞ্চায়ন কেবল একটি নাট্যপ্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বরাক উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নাট্যচর্চার সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় নাট্যজন, নাট্যপ্রেমী, সহযোগী ও দর্শকদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনেও এ ধরনের উদ্যোগ অসমের নাট্যচর্চাকে আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ করবে। গোটা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড° সুদীপা ভট্টাচার্য। তাঁর সাবলীল সঞ্চালনা ও আন্তরিক উপস্থিতি সমগ্র অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

নাটকের জয় হোক—এই প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই শেষ হয় এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *