বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। কলকাতা : ইন্দ্রপতন রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে। প্রয়াত হলেন প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত। মঙ্গলবার সকাল ৭টা নাগাদ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।
শিল্পীর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবণী সেন। তিনি জানান, “বিভাদি এমনিতে সুস্থ-সবলই ছিলেন। মাঝেমধ্যে শুনতাম রক্ত দিতে হচ্ছে। হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল বলেই মনে হয়।”
আড়ালেই থেকে গেলেন আজীবন
ষাট-সত্তরের দশকে যখন সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেনরা খ্যাতির মধ্যগগনে, তখনই নিভৃতে সাধনা করে গেছেন বিভা। প্রচারের আড়ালেই থেকে গেছেন সারাজীবন। জীবনের শেষ দশ-বারো বছরে এসে প্রচারের আলো পান তিনি।
সঙ্গীতশিল্পী অলক রায়চৌধুরী বলেন, “গত ২৯ সেপ্টেম্বর লোকভারতীর পক্ষ থেকে বাড়িতে গিয়ে বিভাদিকে সংবর্ধনা দিয়ে এসেছি। খুব স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন সেদিন। অনেক গল্প হল। উনি কখনও প্রতিযোগিতায় যাননি। অত্যন্ত নিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রছাত্রী তৈরি করেছেন। প্রতিবছর গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মদিন পালন করতেন পরম যত্নে। গান ছাড়া কিছুই ভাবতেন না।”
ত্রিপুরা থেকে কলকাতা
জন্মসূত্রে ত্রিপুরার মানুষ বিভা সেনগুপ্ত ১৯৫৯ সালে কলকাতায় আসেন। প্রথমে মায়া সেনের কাছে দীর্ঘদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখেন। মায়া সেনই তাঁকে নিয়ে যান দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। দেবব্রত বিশ্বাসের তাঁর গান খুব পছন্দ হয়। তারপর থেকেই জর্জদার সান্নিধ্যে, তাঁর তালিমে নিজেকে গড়ে তোলেন বিভা।
গুরুর ছায়া
গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের মতোই গানের ছবি আঁকতে পারতেন তিনি। খোলা গলায়, স্পষ্ট উচ্চারণে, ঋজু ভঙ্গিতে গাইতেন। গানে ছিল এক অপূর্ব কথনভঙ্গি। শেষ বয়সেও সুরে এতটুকু বিচ্যুতি ঘটেনি।
মনোময় ভট্টাচার্যের কথায়, “ওঁর কাছ থেকে অনেক স্নেহ পেয়েছি। মায়ের মতো আদর করতেন। এই বয়সেও এত সুরে গাইতেন, টপ্পার দানাগুলো এত পরিষ্কার আসত, ভাবাই যায় না। খবরটা শুনে সকাল থেকেই মন ভারী হয়ে আছে।”
শ্রীকান্ত আচার্যের স্মৃতিতে, “যাঁর গান ভালো লাগত, নিজে ফোন নম্বর জোগাড় করে যোগাযোগ করতেন। এত বড় শিল্পী হয়েও ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। ছোটদেরও সম্মান দিয়ে কথা বলতেন, এর জন্য বিরাট মনের উদারতা লাগে। বিভাদি শেষ বয়সেও নিখুঁত গান গেয়েছেন। গানটা শ্রোতার সামনে রাখতে জানতেন।”
চোখের সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, নিকট আত্মীয় বিয়োগ— কোনও কিছুই তাঁকে গান থেকে সরাতে পারেনি। কণ্ঠেই ছিল তাঁর বাস। তাঁর চলে যাওয়ায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভুবনে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা অপূরণীয়।












