বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর : শুরু হয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মের অতি পবিত্র পিতৃপক্ষ। পিতৃপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা ও পিতৃঋণ শোধের জন্য তর্পণের সময়। আজ পিতৃপক্ষের দ্বিতীয় দিন। আর দ্বিতীয় দিনেই শিলচরের ঐতিহ্যবাহী ও প্রধান তর্পণ স্থল বরাক নদীর অন্নপূর্ণা ঘাটে দেখা গেল কয়েকশো মানুষের ঢল।
ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ আসছেন এই ঘাটে। হাতে গঙ্গাজল, কালো তিল, তুলসী পাতা নিয়ে বরাকের জলে দাঁড়িয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রপাঠ করছেন তাঁরা। আজ কয়েকশো মানুষ এলেও, আগামী ১৫ দিন ধরে এই সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। মহালয়া পর্যন্ত চলা এই পিতৃপক্ষে অনুমান করা হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ তর্পণ করতে এই অন্নপূর্ণা ঘাটে আসবেন। শুধু সাধারণ মানুষই নন, তর্পণ করতে এই ঘাটে আসেন নেতা, মন্ত্রী, আমলা, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সমাজের বিশিষ্টজনেরাও।
কিন্তু হাজার হাজার মানুষের এই মিলনস্থল অন্নপূর্ণা ঘাটের বর্তমান অবস্থা দেখলে যে কোনো মানুষেরই চোখ কপালে উঠবে। চরম অবহেলা ও উদাসীনতায় ঘাটটি আজ ধ্বংসের মুখে।
দুর্গন্ধ, আবর্জনা ও ঝুঁকির মধ্যেই তর্পণ
সরেজমিনে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের চারপাশে জমে আছে আবর্জনার পাহাড়। প্লাস্টিক, পচা বর্জ্য, মানুষের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপের ফলে ঘাটের পার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। সর্বত্র তীব্র দুর্গন্ধ। বরাক নদীতে নামার সিঁড়িগুলো ভাঙা, শ্যাওলা ধরে পিচ্ছিল হয়ে আছে। পুরোহিতরা যে বসে মন্ত্রপাঠ করবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট ও পরিষ্কার স্থান নেই। যজমানরা যে নিরাপদে দাঁড়িয়ে তর্পণ করবেন, তারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেই হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে বাধ্য হয়ে এই পবিত্র কাজ সারতে হচ্ছে।

রাজনীতির বলি ঐতিহ্যবাহী ঘাট?
এই বেহাল দশা নিয়ে শহরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় নাগরিকদের প্রশ্ন, শিলচরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের প্রধান তর্পণ ঘাটের এই অবস্থা কেন?
প্রবীণ নাগরিকরা জানান, দীর্ঘদিন রাজ্যে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারাও এই ঐতিহ্যবাহী ঘাটটির উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমানে বহু বছর ধরে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বিজেপি নিজেদের হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে পরিচয় দেয় এবং হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে ভোট আদায় করে। কিন্তু সনাতনী ধর্মালম্বীদের কাছে অতি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শাস্ত্রীয় ও সামাজিক কাজ হলো পিতৃ তর্পণ। বৈদিক যুগ থেকে হিন্দু ধর্মে পিতৃঋণ শোধ করার প্রধান উপায় হিসেবে এই তর্পণ প্রথা চলে আসছে।
শহরবাসী আশাবাদী ছিলেন, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে অন্তত এই ঘাটটি সুন্দর ও আধুনিকভাবে তৈরি হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আসাম সরকার এই ঘাটটি তৈরি করতে পারেনি। শহরে স্থানীয় জননেতা, ক্যাবিনেট মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক সবই আছেন, কিন্তু একটা ঘাট তৈরি করে দিতে না পারায় আক্ষেপ করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জনসাধারণ।
“যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে” — আশঙ্কা পুরোহিতের
এদিন ঘাটে তর্পণ করাতে আসা বিশিষ্ট পুরোহিত শান্তিকুমার ভট্টাচার্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আজ সকালেই তর্পণ করতে গিয়ে আমার এক যজমান পা পিছলে বরাক নদীতে তলিয়ে যেতেছিলেন। ভাগ্যক্রমে পাশে থাকা অন্য লোকেরা ছুটে এসে তাঁকে বাঁচান। এই ঘাট যদি সুন্দরভাবে তৈরি না হয়, তাহলে কবে কোন বড় বিপদ আসবে কেউ বলতে পারবে না। বসে মন্ত্র পড়ার মতো ব্যবস্থা নেই, যজমান দাঁড়াবে তার কোনো ব্যবস্থা নেই। চতুর্দিকে শুধু দুর্গন্ধ আর আবর্জনা। শহরে মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক আছেন, তাদের নজরে এসব পড়ছে না, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।”
সরকারের কাছে জোরালো দাবি
এদিন অন্নপূর্ণা ঘাটে তর্পণ করতে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অজয় কুমার রায়। ঘাটের এই করুণ অবস্থা দেখে তিনিও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অবিলম্বে এই ঘাটকে সুন্দরভাবে তৈরি করার জন্য আসাম সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ, মন্ত্রী ও বিধায়কের কাছে জোরালো দাবি জানান।
তর্পণ করতে আসা এক ক্ষুব্ধ নাগরিক বলেন, “এখন পৌরনিগমের নির্বাচন আসছে। তাই জনসেবার নামে একে অন্যকে আক্রমণ করছেন নেতারা, ভোট পাওয়ার জন্য কত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অথচ একটা ঘাট আজ পর্যন্ত তৈরি করে দিতে পারেনি কংগ্রেস, বিজেপি কেউই। আমাদের ভোটে জয়ী হয়ে নেতা-মন্ত্রীরা নিজেরা অট্টালিকা বানাচ্ছে, আর আমরা এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তর্পণ করছি। আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে শুধু রাজনীতি হচ্ছে।”
সব মিলিয়ে শহরবাসীর একটাই দাবি — রাজনীতি বন্ধ করে অবিলম্বে শিলচরের এই ঐতিহ্যবাহী অন্নপূর্ণা ঘাটকে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হোক, যাতে আগামী ১৫ দিনে যে হাজার হাজার মানুষ তর্পণ করতে আসবেন, তাঁরা নির্বিঘ্নে ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁদের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে পারেন।












