গুয়াহাটি, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা ও আবেগের সঙ্গে উদ্যাপিত হতে চলেছে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী জয়ন্ত হাজরিকার ৮৩তম জন্মবার্ষিকী। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায় মাচখোয়ার প্রাগজ্যোতিষ আইটিএ সেন্টারে আয়োজিত হবে এই বিশেষ অনুষ্ঠান। সহযোগিতা রয়েছে সুর বাহিনী এবং বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, গুয়াহাটির।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অসম সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী বিমল বড়া। এছাড়াও উপস্থিত থাকবেন জয়ন্ত হাজরিকার পত্নী মনীষা হাজরিকা, অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি পদ্মশ্রী সূর্য হাজরিকা, প্রাক্তন এ.সি.এস. আধিকারিক কৃষ্ণা বরুয়া, অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সঞ্চালক রাহুল দাস, বিশিষ্ট সমাজসেবক শংকরলাল গোয়েঙ্কা, জুবীন গার্গের পত্নী গরিমা শইকীয়া গার্গ, ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া প্রমুখ।
জয়ন্ত হাজরিকার সংগীত ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে স্মরণ করার পাশাপাশি প্রতি বছরের মতো এবারও সংগীত ও লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হবে ‘জয়ন্ত হাজরিকা ব্যতিক্রম জীবনজোড়া সাধনা বঁটা ২০২৬’। এবারের এই বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন অরুণাচল প্রদেশের বিশিষ্ট গীতিকার, লোকশিল্পী ও সংগীতসাধক রেরিক কার্লো দিগবাক।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী রেরিক কার্লো দিগবাক ১৯৯৯ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও, ইটানগরের শিল্পী হিসেবে অনুমোদন লাভের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন। এরপর আকাশবাণী ও দূরদর্শন কেন্দ্র, ইতানগরে তিনি বহু স্থানীয় লোকগান রেকর্ড করেন। অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও উপভাষায় লোকসংগীতকে সংরক্ষণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আদি, বোকার, আপাতানি, গালো, তাগিন, নিশি, মোনপা, মিজি, মিসিংসহ অরুণাচলের বিভিন্ন ভাষায় তিনি লোকগান রেকর্ড করেছেন। পাশাপাশি হিন্দি ও অসমিয়া ভাষাতেও তাঁর গান রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ভাষায় তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা ৪০৬টি। শুধু গান পরিবেশনই নয়, বহু গানের রচনার পাশাপাশি সেগুলির দৃশ্যায়নে কোরিওগ্রাফির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের জন্য দেশাত্মবোধক গান রচনা ও পরিবেশনের ক্ষেত্রেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
এই সম্মাননার ধারাবাহিকতা ব্যতিক্রম-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। গত পাঁচ বছর ধরে সংগীতের বিভিন্ন ধারায় দীর্ঘদিনের সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করে আসছে ব্যতিক্রম। ২০২১ সালে অসমের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী জে. পি. দাস, ২০২২ সালে কলকাতার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র, ২০২৩ সালে বড়োল্যান্ডের প্রখ্যাত শিল্পী সুলেখা বসুমতারী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী লু মাজাউ এবং ২০২৫ সালে অসমের প্রখ্যাত কার্বি লোকসংগীতশিল্পী পদ্মশ্রী পখিলা লেখথেপিকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে অরুণাচলের লোকসংগীত ও লোকঐতিহ্যের অন্যতম বিশিষ্ট সাধক রেরিক কার্লো দিগবাককে এই সম্মান প্রদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।ব্যতিক্রম গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক-প্রধান ড° সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “জয়ন্ত হাজরিকা শুধুমাত্র একজন অসাধারণ শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের গান ও মানুষের অনুভূতির শিল্পী। তাঁর জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন আমরা তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে এমন শিল্পীদের সম্মান জানাতে পারি, যাঁরা নিজেদের জীবনকে সংগীত ও সংস্কৃতির সেবায় উৎসর্গ করেছেন। রেরিক কার্লো দিগবাক অরুণাচলের বহু ভাষা ও জনগোষ্ঠীর লোকসংগীতকে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করে আসছেন। ৪০৬টি গান রেকর্ড করার পাশাপাশি তাঁর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিতে সক্রিয় ভূমিকা এবং জাতীয় স্বীকৃতি তাঁর সাধনার গভীরতারই প্রমাণ। জয়ন্ত হাজরিকার নামে এই সম্মান তাঁকে প্রদান করতে পেরে আমরা গর্বিত।”
মনীষা হাজরিকা বলেন, “জয়ন্ত হাজরিকাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর গানকে স্মরণ করা নয়, তাঁর সংগীতভাবনা, তাঁর মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আমাদের শিকড়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ককে মনে রাখা। ব্যতিক্রম গত কয়েক বছর ধরে এমন শিল্পীদের সম্মান জানিয়ে আসছে, যাঁরা নিজেদের সংস্কৃতি ও সংগীতকে ভালোবেসে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। রেরিক কার্লো দিগবাক অরুণাচলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকসুর ও ভাষাকে তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ সাধনা সত্যিই প্রশংসনীয়। জয়ন্ত হাজরিকার জন্মবার্ষিকীর মতো একটি দিনে তাঁকে সম্মানিত করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়।”
জয়ন্ত হাজরিকার সংগীতকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী শান্তা উজির, মালবিকা বরা, জে. পি. দাস, সন্ধ্যা মেনন, দিলীপ দাস এবং শিশু শিল্পী শাশ্বত দত্ত। নৃত্য পরিবেশন করবেন সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার প্রাপক অনিতা শর্মা ও তাঁর সঙ্গীবৃন্দ। সংগীত ও নৃত্যের এই বিশেষ পরিবেশনা জয়ন্ত হাজরিকার কালজয়ী সৃষ্টির প্রতি এক আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে জয়ন্ত হাজরিকার কালজয়ী গান, তাঁর সংগীতজীবন ও উত্তরাধিকারের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের বৈচিত্র্যময় লোকসংগীত ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হবে। ব্যতিক্রম-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জয়ন্ত হাজরিকার স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের শিল্পী ও লোকসংস্কৃতির সাধকদের যথাযথ সম্মান প্রদান করাই এই ধারাবাহিক উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে জয়ন্ত হাজরিকা প্রেমী সবাইকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ব্যতিক্রম গ্রুপ।












