ব্যতিক্রম-এর উদ্যোগে ভারতরত্ন ড.ভূপেন হাজারিকার অমর উত্তরাধিকার উদ্যাপন
গুয়াহাটি, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ভারতরত্ন, সুধাকণ্ঠ ড.ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ৮ সেপ্টম্বর শিলচরের বঙ্গভবনে আয়োজিত হল এক বর্ণময় ও আবেগঘন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। অসম সরকারের সাংস্কৃতিক পরিক্রমা বিভাগ, মিরকি এসোসিয়েটস-এর সহযোগিতায় এবং ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে সংগীত, নৃত্য, স্মৃতিচারণ ও সম্মাননার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ভারতীয় সংগীত ও সংস্কৃতির অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ড ভূপেন হাজারিকাকে।
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই তৈরি হয় এক অনন্য আবহ। ১০০ জন কণ্ঠশিল্পী একসঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। শত কণ্ঠের সম্মিলিত সুরে ভেসে ওঠে ভূপেন হাজারিকার সংগীতের চিরন্তন আবেদন। জন্মশতবর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১০০ জন শিল্পীর এই সম্মিলিত পরিবেশনা অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। তারপর প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী তথা ভূপেন হাজরিকার ভাতৃবধূ মনীষা হাজরিকা, অধিবক্তা সীমা শর্মা, সোহেলী শীল সরকার, সমাজকর্মী অঞ্জন পাল ও মিতালী সরকার, শিলচর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নন্দিনী চক্রবর্তী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিবানী ধর, স্টাইলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জেরিনা লস্কর, দিল্লি হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ও সংগীতশিল্পী দেবনীতা সিনহা, অসম সরকারের প্রাক্তন কমিশনার রাজবী হুসেন এবং অসম সরকারের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন আধিকারিক স্নেহাংশু শেখর রায়, ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া প্রমুখ।
স্বাগত ভাষনে ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড. সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “ভূপেন হাজারিকার গান মানুষের গান, মাটির গান এবং মানবতার গান। তাই তাঁর জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে আমরা শুধু একটি অনুষ্ঠান করতে চাইনি; আমরা চেয়েছি দক্ষিণ অসমের প্রত্যন্তপ্রান্তের প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ভূপেনদার সংগীতের একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করতে। তাঁদের কণ্ঠে ভূপেনদার গান শোনা এবং তাঁদের প্রতিভাকে একটি বড় মঞ্চে তুলে ধরতে পারা আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়।
ব্যতিক্রম গত কয়েক বছর ধরে ভূপেন হাজারিকার সংগীত ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছে। জন্মশতবর্ষের এই বিশেষ বছরে দক্ষিণ অসমের ১৪টি সমষ্টিকে নিয়ে এত বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রতিভার অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, ভূপেন হাজারিকার গান ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি নতুন প্রজন্মের ভালোবাসা আজও কতটা গভীর। আমরা বিশ্বাস করি, আজকের এই প্রতিভাবান শিল্পীরাই আগামী দিনে ভূপেন হাজারিকার অমর সৃষ্টিকে আরও দূরে, আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।”
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে মনীষা হাজারিকা বলেন, “ভূপেনদার গান শুধু একটি অঞ্চলের নয়, তাঁর গান মানুষের গান। তাই তাঁর সৃষ্টিকে বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে তাঁর সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করার যে কাজ বাতিক্রম দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, সেটি অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে দক্ষিণ অসমের তরুণ শিল্পীদের নিয়ে এই আয়োজন এবং তাঁদের ভূপেনদার গান গাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি ব্যতিক্রমের এই দীর্ঘ পথচলা ও আন্তরিক উদ্যোগের জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এবং ভবিষ্যতেও এই প্রয়াস আরও এগিয়ে যাবে-এই প্রত্যাশা রাখি।”
তিনি আরও বলেন, “ভূপেনদার জন্মদিন ও তাঁর সৃষ্টিকে ঘিরে ব্যতিক্রম গ্রুপগত ১১ বছর ধরে যে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিয়ে আসছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, কলকাতা থেকে শুরু করে অসমের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যতিক্রম যেভাবে ভূপেনদার জন্মদিন পালন করে তাঁর গান, চিন্ত ও মানবিক দর্শনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। এবার দক্ষিণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ও শিল্পীদের যুক্ত করে জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের যে আয়োজন ব্যতিক্রম করেছে, তা আরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।”
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় বাংলা লোকগানের দল দোহারকে ‘ভারতরত্ন ড.ভূপেন হাজরিকা ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক সম্মাননা ২০২৬’ প্রদান। সংগীত ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ঐক্য ও সম্প্রীতির ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননা গ্রহণের পর রাজীব দাস বলেন, “এই সম্মান আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের এবং একইসঙ্গে আবেগের মুহূর্ত। ১৯৯৯ সালের ৭ আগস্ট কলকাতায় গান-বাজনাকে সঙ্গে নিয়ে দোহার-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ ২৭ বছরের পথচলায় আমরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলার লোকগান ও লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি। বহু সম্মাননা আমরা পেয়েছি, কিন্তু ব্যতিক্রমের কাছ থেকে পাওয়া এই সম্মান আমাদের কাছে বিশেষ ও অনন্য।”
তিনি আরও বলেন, “বরাক উপত্যকা এবং অবিভক্ত বাংলার লোকসংগীতের ঐতিহ্য, স্বদেশি বাদ্যযন্ত্র এবং বাংলার মাটির সঙ্গে যুক্ত সুরকে সামনে রেখেই দোহার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ২০১৬ সাল থেকে ভূপেন হাজারিকার গানকে কেন্দ্র করেও বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে আমাদের পরিবেশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়েছে। ভূপেনদার গান আমাদের কাছে শুধু সংগীত নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম।”
অনুষ্ঠানে দোহার-এর পক্ষ থেকে বিশেষ সংগীত পরিবেশনাও ছিল। সংগীত পরিবেশনে অংশ নেন রাজীব দাস, মৃগনাভী চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ সরকার ও সুদীপ্ত চক্রবর্তী। তাঁদের পরিবেশনায় উঠে আসে বাংলার লোকসংগীতের শিকড় এবং ভূপেন হাজারিকার মানবিক চেতনার সঙ্গে তার এক অনন্য সংযোগ।
অনুষ্ঠানের আরেকটি অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল লাইভ আর্টিস্টদের শিল্পকর্ম ও সৃজনশীল পরিবেশনা। লাইভ আর্টে অংশ নেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজদীপ বর্মন, প্রিয়াংশু রায়, তাপসী দে, নন্দনী দেব, রিতম দাস, অরুণ পাল চন্দ্রিমা শ্যাম, অজয় নাস, পামেল হুইরেম। তাঁদের তুলির টানে ও শিল্পীসত্তার প্রকাশে ভূপেন হাজারিকার সংগীত ও উত্তরাধিকারের বিভিন্ন দিক ফুটে ওঠে। সংগীতের পাশাপাশি চিত্রশিল্পের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে।
জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতার পুরস্কারও প্রদান করা হয়। তিনটি বিভাগে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ট্রফি, প্রশংসাপত্র ও অর্থপুরস্কার। ক-বিভাগে প্রথম হন রেশমী সেন, দ্বিতীয় সৌরভ পাল এবং তৃতীয় দীপায়ন রায়। সান্ত্বনা পুরস্কার পান আরাধ্যা রায়। খ-বিভাগে প্রথম হন স্বরূপ চন্দ, দ্বিতীয় অম্বরীশ পাল এবং তৃতীয় ছন্দবীণা পাল। সান্ত্বনা পুরস্কার পান নন্দিনী ঘোষ ও অবিক্সিত চক্রবর্তী। গ-বিভাগে প্রথম হন প্রিয়াঙ্কা দে রায়, দ্বিতীয় রাধারাণী নাথ এবং তৃতীয় সুপর্ণা দাস ভট্টাচার্য। সান্ত্বনা পুরস্কার পান ইমানুয়েল টোউলর ও সপ্তপর্ণা নাথ।
দক্ষিণ অসম ভূপেন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতার সফল আয়োজনের পেছনে যাঁরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন, তাঁদেরও এদিন বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। প্রতিযোগিতার দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়কের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়ে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও মূল্যবান অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এই প্রতিযোগিতাকে দক্ষিণ অসমের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া এবং বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রতিভাকে মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সমন্বয়কদের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক পর্বে নিরন্তর গ্রুপের নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। ছন্দ, অভিব্যক্তি ও নৃত্যভঙ্গির সুন্দর সমন্বয়ে তাঁদের পরিবেশনা ভূপেন হাজারিকার সংগীতের সঙ্গে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি তরুণ শিল্পী আশ্বাস আয়ুদ্বান, গীতাঞ্জলি কাকতি এবং জয়তী ভট্টাচার্যের সংগীত পরিবেশনা ও দর্শক-শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়।
অনুষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সঞ্চালক সায়ন বিশ্বাস। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা, প্রাণবন্ত সঞ্চালনা এবং প্রতিটি পর্বের মধ্যে সুন্দর সংযোগ অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ড.ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান প্রমাণ করে, সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর গান ও দর্শনের আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে, নৃত্যের ছন্দে এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় তাঁর সৃষ্টির আলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তাঁর গান আজও মানুষকে একত্রিত করে, সম্প্রীতির বার্তা দেয় এবং আগামী দিনের সাংস্কৃতিক পথচলায় অনুপ্রেরণা জোগায়।
শতকণ্ঠে যখন ধধ্বনিত হয় ‘মানুষ মানুষের জন্য’, তখন বঙ্গভবনের পরিবেশ হয়ে ওঠে গভীর আবেগময়। সেই সম্মিলিত কণ্ঠ যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়-ভূপেন হাজারিকার গান কোনও একটি বছর, কোনও একটি অনুষ্ঠান কিংবা কোনও একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় মানুষের জন্য তাঁর গান, মানুষের কাছেই তাঁর উত্তরাধিকার। আর সেই উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে, শিল্পীর সৃষ্টিতে এবং মানুষের ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের প্রকৃত সার্থকতা।












