বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে শুধু কয়েক দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে ধারাবাহিক জনআন্দোলনের চেহারা দিতে চায় অসম। ২০২৬-এর ‘স্বচ্ছতা হি সেবা’ কর্মসূচির প্রস্তুতি ও রূপরেখা নিয়ে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রকের বৈঠকে এমনই বার্তা দিলেন অসমের আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী কৌশিক রায়। কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরের পৌরোহিত্যে আয়োজিত ভার্চুয়াল বৈঠকে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ বার ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে ‘স্বচ্ছতা হি সেবা ২০২৬’। এ বছরের মূল ভাবনা “স্বচ্ছতায় সকলের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ ভারত, বিকশিত ভারত”। সরকারি বিভাগের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে যুক্ত করে কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কাছাড়ের জেলা আয়ুক্তের কার্যালয় থেকে বৈঠকে যোগ দিয়ে মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, ২০১৭ সাল থেকেই অসম উৎসাহ এবং ব্যাপক জনঅংশগ্রহণের সঙ্গে এই অভিযানে সামিল হয়ে আসছে। এ বারও স্বচ্ছতা হি সেবা-কে অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী জনআন্দোলনে পরিণত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী কৌশিক রায় তাঁর বক্তব্য বলেন স্বচ্ছতা মানে শুধু রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা নয়। সরকার ও নাগরিকদের একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং আরও মজবুত অসম গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি করে এই কর্মসূচি। তাঁর কথায়, শহরের সাফাইয়ের দায়িত্ব শুধু নগর স্থানীয় সংস্থা বা সাফাইকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে হবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দফতর, যুবসমাজ, পড়ুয়া, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক সকলকেই এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রত্যেকের দায়িত্ব স্পষ্ট করে দেওয়াই এই অভিযানের সাফল্যের চাবিকাঠি বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী কৌশিক রায় জানান, কেন্দ্রের নির্ধারিত পাঁচটি মূল স্তম্ভকে সামনে রেখে অসম ইতিমধ্যেই নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচির দিনপঞ্জি তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্যমাত্রা এলাকা (CTU) এবং পরিচ্ছন্ন জনস্থানগুলির রূপান্তর, ‘স্বচ্ছ পাঠশালা স্বচ্ছতার জন্য যুবসমাজ’, ‘সাফাই মিত্র সুরক্ষা এবং সম্মান শিবির’, ‘স্বচ্ছতার জন্য জনঅংশগ্রহণ’ এবং ‘স্বচ্ছতা থেকে সমৃদ্ধি’।
‘স্বচ্ছ পাঠশালা স্বচ্ছতার জন্য যুবসমাজ’ কর্মসূচিতে স্কুল, কলেজ, এনএসএস, এনসিসি, ইকো-ক্লাব এবং যুব স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত করা হবে। বর্জ্য চার ভাগে পৃথকীকরণ, দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য কমানো-পুনর্ব্যবহার-পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পরিদর্শন, ‘স্বচ্ছতা সংবাদ’, বিতর্ক এবং বিষয়ভিত্তিক শিল্প প্রতিযোগিতার মতো কর্মসূচির মাধ্যমে পড়ুয়া ও যুবসমাজকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্যমাত্রা এলাকা এবং আবর্জনা জমার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে সেগুলির চেহারা বদলের উদ্যোগও নেওয়া হবে। সৌন্দর্যায়নের পাশাপাশি থাকবে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ। বাজার, পর্যটনকেন্দ্র, সরকারি প্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লা, সরকারি ও কমিউনিটি শৌচালয়, পরিবহণ কেন্দ্র, উদ্যান, জলাশয় এবং জনসমাগম বেশি হয় এমন এলাকাগুলিকে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জনঅংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাড়ি-বাড়ি সচেতনতা অভিযান, উৎসস্থলেই চার ধরনের বর্জ্য পৃথকীকরণ, বাড়িতে জৈব বর্জ্য থেকে সার তৈরি, প্লাস্টিকমুক্ত উদ্যোগ এবং বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কর্মসূচি চালানো হবে। ‘স্বচ্ছতার জন্য ক্রীড়া’, কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ, RRR কেন্দ্রগুলির পুনরুজ্জীবন এবং স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিও নেওয়া হবে।

সাফাইকর্মীদের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘সাফাই মিত্র সুরক্ষা এবং সম্মান শিবির’-এ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা, সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণ এবং সাফাই মিত্র ও সাফাইকর্মীদের অবদানের স্বীকৃতির উপর জোর দেওয়া হবে। তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং কল্যাণ শুধু এই অভিযানের সময় নয়, সারা বছরই অগ্রাধিকারের বিষয় হওয়া উচিত বলে জানান তিনি।
‘স্বচ্ছতা থেকে সমৃদ্ধি’ কর্মসূচিতে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার ধারণাকে সামনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে ‘কবাড় সে জুগাড়’, ‘কবাড় সে কলা’, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার মেলা, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ অভিযান এবং বেশি পরিমাণে বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে পুনর্ব্যবহারকারীদের সংযোগ তৈরি করার উদ্যোগ।
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসেও পরিচ্ছন্নতাকে সামনে রাখা হবে। পর্যটনকেন্দ্র এবং জনসমাগম বেশি হয় এমন জায়গায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি হবে। ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর ‘স্বচ্ছতা থেকে সমৃদ্ধি’-কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৩০ সেপ্টেম্বর দিনটি রাখা হয়েছে ‘সাফাই মিত্র সুরক্ষা এবং সম্মান শিবির’-এর জন্য।
১ অক্টোবর দেশজুড়ে ‘এক দিন, এক ঘণ্টা, একসঙ্গে’ কর্মসূচিতেও অংশ নেবে অসম। মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, মেয়র, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মী, যুবসমাজ, ক্রীড়াবিদ এবং সাধারণ নাগরিকেরা এই কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাশ্রমে যোগ দেবেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলবে এই দেশব্যাপী উদ্যোগ।
২ অক্টোবর স্বচ্ছ ভারত দিবস উপলক্ষে মহাত্মা গান্ধীর স্বচ্ছতার বার্তাকে স্মরণ করা হবে। জনঅংশগ্রহণের পাশাপাশি নগর স্থানীয় সংস্থাগুলিতে বিশেষ কাউন্সিল বৈঠক এবং ‘এক পেড় মা কে নাম’ কর্মসূচির মাধ্যমে শহরের সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, স্বচ্ছতা হি সেবা যেন শুধু লোক দেখানো পরিচ্ছন্নতা অভিযানে আটকে না থাকে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনার উপর জোর দিতে হবে। পরিচ্ছন্নতা যাতে কোনও বিশেষ দিনের কর্মসূচি না হয়ে প্রতিদিনের অভ্যাস এবং জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
অসমবাসীর উদ্দেশে সক্রিয় ভাবে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবরের কর্মসূচি শেষ হয়ে গেলেও স্বচ্ছতার এই উদ্যোগ থেমে থাকা উচিত নয়। বরং তাকে ধারাবাহিক জনআন্দোলনে পরিণত করে জীবনের অঙ্গ করে তুলতে হবে।
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধের মাধ্যমে স্বচ্ছতা হি সেবা ২০২৬ কে জনকেন্দ্রিক, সকলকে নিয়ে চলা এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে পরিণত করার লক্ষ্যেই অসম এগোচ্ছে বলে ফের জানিয়েছেন মন্ত্রী কৌশিক রায়।












