বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। নয়াদিল্লি: ভারত-নেপাল সীমান্তের লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে পুরনো বিবাদ আবার মাথা চাড়া দিয়েছে। কাঠমান্ডুর বক্তব্য, এই তিনটি অঞ্চল তাদের। কিন্তু যুক্তি হিসেবে তারা যে ২১০ বছরের পুরনো সুগৌলি চুক্তির কথা বলছে, সেই চুক্তির মূল কপিই তাদের কাছে নেই।
নেপালের সংসদে দাঁড়িয়ে বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল নিজেই এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি জানান, সরকারের সব স্তরে খোঁজ চালানো হয়েছে। জাতীয় আর্কাইভ, বিভিন্ন মন্ত্রক, গ্রন্থাগার, সংগ্রহশালা — কোথাও ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির আসল সরকারি নথি মেলেনি। কিছু পুরনো কাগজপত্রের উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু সেগুলি আদৌ আসল চুক্তির কপি কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
খানাল আরও বলেন, ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির নথিও তাদের কাছে আছে। তবে সেটিও মূল কপি কি না, সে বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।
বিবাদের গোড়ায় সুগৌলি চুক্তি
১৮১৪ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত চলা অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নেপালের সুগৌলি চুক্তি হয়। ১৮১৫ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৮১৬ সালের মার্চে তা চূড়ান্ত হয়। এই চুক্তিতেই কালী বা মহাকালী নদীকে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত বলে নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে এই চুক্তিকেই নেপালের আধুনিক সীমানার ভিত্তি ধরা হয়।
কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে নদীর উৎস নিয়ে। ভারত ও নেপাল, দুই দেশই কালী নদীর উৎপত্তিস্থল আলাদা জায়গায় দেখায়। এই মতপার্থক্যের কারণেই লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। নেপালের দাবি, সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী এলাকাগুলি তাদের সীমার মধ্যে পড়ে।
মূল দলিল না পাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়
শুধু সুগৌলি চুক্তিই নয়, ১৯৫০ সালের শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির আসল কপিও নেপাল বহু বছর ধরে খুঁজছে। ২০১৬ সালে যখন দুই দেশের এমিনেন্ট পার্সনস গ্রুপ চুক্তি পর্যালোচনার কাজ শুরু করে, তখন নেপালের তরফে আসল কপি জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ডেক বাহাদুর থাপা কমিটির হাতে একটি দ্বিতীয় কপি তুলে দিতে হয়েছিল।
২০১৯ সালে তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রদীপ গাওয়ালি সংসদে বলেছিলেন, হাতে থাকা কপিগুলি আসল কি না তা যাচাই করতে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই প্রস্তাব আর কার্যকর হয়নি।
এখন প্রশ্ন একটাই
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চুক্তির মূল নথি যখন নিজের কাছেই নেই, তখন সেই চুক্তির ভিত্তিতে দাবি কতটা জোরালো হবে? কূটনৈতিক মহলের মতে, নথির অনুপস্থিতি আলোচনার টেবিলে নেপালকে দুর্বল অবস্থানে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট — ঐতিহাসিক তথ্য, মানচিত্র ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতেই লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা ভারতের অংশ।
নথির খোঁজ না মেলায় আপাতত সীমান্ত সমস্যার সমাধান আরও দূরেই থেকে গেল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।












