দুই শতাধিক মানুষের স্বাক্ষরে আরও জোরালো হলো বরাকবাসীর দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন: বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও জোরালো ও জনমুখী করে তুলতে হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটির উদ্যোগে এবং ‘ইয়ুথস এগেইনস্ট সোশ্যাল ইভিলস’ (ইয়াসি)-এর সহযোগিতায় রবিবার দুপুর ১২টায় ধোয়ারবন্দ রিসোর্টে এক সচেতনতা সভা ও গণস্বাক্ষর অভিযান অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, সমাজকর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সভাস্থলে শুরু থেকেই উৎসাহ ও উদ্দীপনার পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ড.বিভাস দেব, কমিটির উপদেষ্টা ও বিজেপি নেতা উদয় শঙ্কর গোস্বামী, উপদেষ্টা বিশিষ্ট আইনজীবী প্রসেনজিৎ দেব, শিলচর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দেব, আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব, আইনজীবী তুহিনা শর্মা, সমাজসেবী রসরাজ দাস, ধলাই জেলা পরিষদের সদস্য ধর্মেন্দ্র তেওয়ারি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জিতেন্দ্র কুমার শুক্লবৈদ্য, ধোয়ারবন্দ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রজত দাসগুপ্ত, ইয়াসির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সঞ্জীব রায় এবং যুগ্ম সম্পাদক মান্না দত্ত সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ইয়াসির প্রধান আহ্বায়ক বাবুল রাই উপস্থিত অতিথিবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বরাক উপত্যকার মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন এবং এই আন্দোলনকে গণআন্দোলনের রূপ দিতে যুব সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এরপর হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির উপদেষ্টা ড.বিভাস দেব সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষের বাসভূমি বরাক উপত্যকার জনগণের জন্য একটি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিচার সংক্রান্ত প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে শত শত কিলোমিটার দূরে গৌহাটি যেতে হয়, যার ফলে সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয় হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। তিনি বলেন, বিচারপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থেই বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির উপদেষ্টা বিশিষ্ট আইনজীবী প্রসেনজিৎ দেব তাঁর বক্তব্যে বলেন, বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা কোনো আঞ্চলিক সুবিধার বিষয় নয়, বরং এটি বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ ন্যায়সঙ্গত দাবি জানিয়ে আসছেন এবং সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব তাঁর তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্যে বিষয়টির ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি ব্রিটিশ আমলের ফোর্ট উইলিয়াম কোর্ট থেকে শুরু করে শিলংয়ে উচ্চ আদালতের কার্যক্রম, গৌহাটি হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচারব্যবস্থার ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৭২ সালে শিলচর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন বরাক উপত্যকায় একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। এছাড়া ২০১৮ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কর্তৃক প্রকাশিত একটি গ্রন্থেও বরাক উপত্যকায় বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও যৌক্তিকতার উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব, বিপুল জনসংখ্যা, মামলার সংখ্যা এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিভিন্ন স্থানে হাইকোর্টের বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হলেও বরাক উপত্যকার মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি এখনও বাস্তবায়িত না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
ইয়াসির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সঞ্জীব রায় তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইয়াসি প্রথম থেকেই এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও আন্দোলনকে আরও জনমুখী ও শক্তিশালী করে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, বরাক উপত্যকার মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে যুব সমাজ সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
ময়নাউল হক চৌধুরী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সুমিতা ঘোষ, হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির উপদেষ্টা উদয় শঙ্কর গোস্বামী, সমাজসেবী রসরাজ দাস, ধলাই জিলা পরিষদের সদস্য ধর্মেন্দ্র তেওয়ারি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জিতেন্দ্র কুমার শুক্লবৈদ্য এবং ধোয়ারবন্দ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রজত দাসগুপ্ত তাঁদের বক্তব্যে বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি জনস্বার্থমূলক দাবি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই দাবির গুরুত্ব উপলব্ধি করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
প্রশ্নোত্তর ও ইন্টার্যাকটিভ সেশন পরিচালনা করেন আইনজীবী তুহিনা শর্মা। অনুষ্ঠানের শেষে ইয়াসির ধলাই বিধানসভা কমিটির সভাপতি শেখর ধর ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন। সমগ্র অনুষ্ঠান অত্যন্ত সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন আইনজীবী দেবোমিতা চক্রবর্তী।
সচেতনতা সভার পর আয়োজিত গণস্বাক্ষর অভিযানে নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এদিন দুই শতাধিক মানুষ গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবির সমর্থনে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই বিপুল গণসমর্থন বরাকবাসীর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিতে আগামী দিনগুলোতে শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি জেলাতেও ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভা, গণসংযোগ কর্মসূচি ও গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালিত হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই জোরদার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কমিটির নেতৃবৃন্দ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বরাকবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন এবং ধারাবাহিক গণআন্দোলনের মাধ্যমে একদিন এই দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।












