বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর : আগামী ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় অসমের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর শিলচর পুর নিগমের প্রথম ঐতিহাসিক নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে শুক্রবার বঙ্গভবনে নিজেদের নির্বাচনী সংকল্পপত্র প্রকাশ করল বিজেপি।
দলের তরফে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস ও সবকা প্রয়াস’ এবং মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার ‘বিকশিত আসাম, বিকশিত বরাক’-এর স্বপ্নকে সামনে রেখেই এই উন্নয়নমূলক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। শিলচর শহরের ১৫.৩৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা এবং ৪২টি ওয়ার্ডের ৩ লক্ষেরও বেশি নাগরিকের জন্য এই মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সংকল্পপত্রে ৭ দফা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

১. জল নিষ্কাশন ও কৃত্রিম বন্যামুক্ত শিলচর
শিলচরের দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা কৃত্রিম বন্যা মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি।
– পাম্পিং স্টেশন: বর্ষাকালে মালুগ্রাম, তারাপুর, রাঙ্গিরখাড়ি, সোনাই রোড, লিংক রোড, শরৎপল্লী ও বিলপার এলাকায় জমে থাকা জল দ্রুত সরাতে আধুনিক Pumping Station স্থাপন।
– নদী ও খালের সংযোগ: রাঙ্গিরখাল, বাছাইভাল, লঙ্গাইভাল, সিঙ্গিরখাল ও টাউন খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি করে সেগুলোকে ঘাগরা নদী ও বরাক নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হবে।
– আরসিসি ড্রেন: শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে ঢাকনাযুক্ত RCC Drain নির্মাণ এবং বরাক নদীর বাঁধ মেরামত ও স্লুইস গেটের আধুনিকীকরণ।
২. ২৪×৭ বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ
শহরের পুরনো ও জরাজীর্ণ জলের পাইপলাইনগুলো পর্যায়ক্রমে মেরামত ও পরিবর্তন করা হবে। প্রতিটি জোনে নতুন Overhead Tank নির্মাণ অথবা বর্তমান ট্যাঙ্কগুলোর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে প্রতিটি ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হবে।
৩. পরিচ্ছন্ন শিলচর ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
– উৎসস্থলেই আবর্জনা পৃথকীকরণ এবং ১০০% বাড়ি বাড়ি থেকে আবর্জনা সংগ্রহ।
– মেহেরপুরের Waste Management Plant-এ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ দ্রুত শেষ করা।
– রাস্তায় বা নালায় আবর্জনা ফেলা রুখতে ডিজিটাল পদ্ধতি ও QR Code-এর মাধ্যমে নজরদারি।
– রাতে আবর্জনা পরিষ্কার ও আধুনিক Trenchless Techniques-এর মাধ্যমে গর্ত ও রাস্তা মেরামত।
৪. যানজটমুক্ত শহর ও আধুনিক যোগাযোগ
শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনের জন্য আন্ডারপাস, ব্রিজ, মাল্টিপারপাস পার্কিং ও কমন পার্কিং-এর ব্যবস্থা। শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে নো-পার্কিং জোন ও ই-রিকশা স্ট্যান্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আবর্জনা তোলার গাড়িতে Vehicle Tracking System চালু করা হবে।
৫. নাগরিক পরিষেবা ও দুর্নীতিমুক্ত পুরনিগম
– ই-সুবিধা (e-Suvidha) পোর্টাল: মিউনিসিপ্যাল হোল্ডিং, জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র, সম্পত্তিকর, বিল্ডিং পারমিশন ও ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি।
– স্মার্ট শিলচর অ্যাপ (Smart Silchar App): একটি সমন্বিত অ্যাপের মাধ্যমে জল, আলো, ড্রেনেজ ও সম্পত্তিকর সংক্রান্ত পরিষেবা এবং ২৪×৭ অভিযোগ ট্র্যাকিং ও এমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম।
– পুরনিগম এলাকাকে ৪টি জোনে ভাগ করে ৪টি পুর প্রশাসনিক পরিষেবা কেন্দ্র স্থাপন।
৬. স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বাজার কল্যাণ
প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, পার্ক ও খেলার মাঠের আধুনিকীকরণ, সবুজায়ন এবং শহরের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৭. যুবকল্যাণ ও শিক্ষা
যুবকদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ডিজিটাল লাইব্রেরি, পুরনিগমের স্কুলগুলোর আধুনিকীকরণ এবং খেলাধুলার পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে, এই সংকল্পপত্র কেবল একটি প্রতিশ্রুতির দলিল নয়, বরং শিলচরবাসীর কাছে দলের একটি দৃঢ় ‘দায়বদ্ধতা’। ‘ট্রিপল ইঞ্জিনের’ শক্তির সাহায্যে শিলচরকে দক্ষিণ অসমের একটি আধুনিক ও মডেল শহর হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের আশীর্বাদ চেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ শইকীয়া, মন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বরুয়া, কৌশিক রায় ও কৃষ্ণেন্দু পাল, সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, রাজ্যসভার সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ ও সুস্মিতা দেব, বিধায়ক রাজদীপ রায়, বিজয় মালাকার, মিহির কান্তি সোম, কিশোর নাথ সহ দলের অন্যান্য নেতা, ৪২টি ওয়ার্ডের প্রার্থী ও কার্যকর্তারা।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে দিলীপ শইকীয়া ও জয়ন্ত মল্ল বরুয়া জানান, পৌরনিগমে বিজেপি বোর্ড গঠন করলে সংকল্পপত্রে উল্লেখ করা প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ট্রিপল ইঞ্জিন সরকারের মাধ্যমে শিলচরকে দক্ষিণ অসমের মডেল শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
শিলচরের প্রথম পৌরনিগম নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক প্রচার তুঙ্গে। বিজেপির এই সংকল্পপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।












