কল্পিতা দেব: উনিশ শতকের শেষভাগে রচিত অ্যান্টন পাভলোভিচ চেখভের ‘অ্য মেরেজ প্রপোজাল’ নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে হাস্যরসের কথা। কিন্তু চেখভের ক্ষেত্রে এই হাস্যরস কখনো শুধু হাসানোর জন্য নয়, বরং তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের অহংকার, জেদ, সম্পর্কের অদ্ভুত সমীকরণ। অতি সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অসামান্য নাটকীয়তাই তাঁর হাস্যরসের অন্যতম শক্তি। সেই চেখভের ‘অ্য মেরেজ প্রপোজাল’ অবলম্বনে রমেন লাহিড়ীর অনুবাদে শিলচর থিয়েটারের নতুন প্রযোজনা ‘সোলমেট’।
গত ১৫ আগস্ট, শনিবার শিলচরের সঙ্গীত বিদ্যালয়ে প্রথম মঞ্চায়ন হল নাটকটি। শুরুতেই বলে রাখা দরকার, ‘শিলচর থিয়েটার’ নাট্যদল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এটাই তাদের প্রথম প্রযোজনা। এবং প্রথম প্রযোজনাতেই চেখভের মতো বিশ্ববরেণ্য নাট্যকারের নাট্য রচনাকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। এই নাটকটি নিছক একটি ‘বিয়ের প্রস্তাবের নাটক’ নয়, বরং প্রস্তাব দিতে আসা মানুষটি কীভাবে সেই প্রস্তাবের কথা ভুলে গিয়ে নিজের অহংকার এবং তর্কে জড়িয়ে পড়ে, তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আসল কাহিনি। ভালোবাসার জায়গায় যুক্তি, যুক্তির জায়গায় জেদ এবং জেদের জায়গায় আবার সম্পর্ক; এই গোলকধাঁধাই চেখভের আসল রস এবং হাস্যকর আত্মকেন্দ্রিকতার গল্প। আর এই গল্পকেই ইন্টিমেট বা অন্তরঙ্গ থিয়েটারের আঙ্গিকে মঞ্চে আনার সিদ্ধান্তটি প্রযোজনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এ ধরনের থিয়েটারে দর্শক আর মঞ্চের মধ্যে দূরত্ব কমে যায়। ফলে অভিনেতার মুখের অভিব্যক্তি, সংলাপের ফাঁকে তৈরি হওয়া বিরতি এই সবকিছুই দর্শকের চোখের বেশি সামনে চলে আসে। ফলে ইন্টিমেট স্পেসে অভিনয় করার ক্ষেত্রে অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের চাপও থাকে বেশি। তাই শিলচর থিয়েটারের ‘সোলমেট’-এর মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে এই পরিসর একই সঙ্গে ছিল, নতুন সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জের।
চেখভের টেক্সটের সবচেয়ে বড় শক্তি হল সাধারণ কথোপকথনকে নাটকীয় করে তোলা। এখানে কেউ যুদ্ধ করছে না, কোনও বিরাট রাজনৈতিক সংকট নেই, নেই কোনও অসাধারণ ঘটনা। আছে মাত্র কয়েকজন মানুষ এবং তাঁদের নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকা। অথচ সেই মানুষগুলিই যখন সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নিতে বসে, তখন কথাবার্তা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে দর্শক হাসতে বাধ্য হন। ‘সোলমেট’ এর ক্ষেত্রেও সেই হাসির জায়গাগুলোই মূল চালিকাশক্তি। যা এই প্রযোজনাতে খুব সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে।
এবার আসি অভিনয় প্রসঙ্গে। নাটকে মোট তিনজন অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে বিন্দুবাসিনী চরিত্রে অভিনয় করেছেন উপত্যকার বিশিষ্ট অভিনেত্রী মৌটুসী বিশ্বাস। অন্তরঙ্গ মঞ্চে তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চরিত্রটিকে অতিরিক্ত অভিনয় না করে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। কারণ চেখভীয় চরিত্ররা নিজেদের কখনও হাস্যকর মনে করে না। তারা নিজেদের আচরণকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে করে। মৌটুসী বিশ্বাস যথাযথ মুন্সিয়ানায় চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্তরঙ্গ মঞ্চের চাহিদা অনুযায়ী তাঁর অভিনয় ছিল সংযত এবং ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য। বিশেষ করে মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং স্বাভাবিক সংলাপ প্রক্ষেপণে চরিত্রটির অনুভূতিগুলি সুন্দর ধরা পড়েছে।
সদানন্দ চরিত্রে শান্তনুস্বরাপ রায়। অভিনেতা ও নির্দেশকের উভয় দায়িত্ব সামলেও চরিত্রটিকে যথেষ্ট সাবলীল ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ডায়ালগ থ্রয়িং। সেইসঙ্গে বাবার চরিত্রে অভিনেতা সমরেন্দ্র দেব নাটকে আলাদা মাত্রা যোগ করলেন। তাঁর উপস্থিতি নাটকে সম্পর্কের সমীকরণকে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করেছে।
এবার কথা হল, শুধুমাত্র অভিনয়ের মধ্য দিয়ে একটি থিয়েটার পূর্ণতা পায় না। তাই একটি টেক্সট যখন থিয়েটারে রূপ নেয়, তখন শুধু অভিনয় নয়, তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি টেকনিক্যাল উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই নাটকে অঙ্কন কংসবণিকের মঞ্চসজ্জা ছিল পরিমিত ও রুচিসম্মত। আলোয় রূপরাজ দেব মঞ্চের পরিসরকে মাথায় রেখে যতটা যা করা সম্ভব, করেছেন। আবহসংগীতে স্বর্ণদীপ দেব ও দীপঙ্কর পাল ছিলেন যথাযথ। যথাযথ রূপসজ্জা স্বপনকান্তি করের।
পরিসরের কথা মাথায় রেখে অভিনেতাদের মঞ্চ বিচরণে অতিরিক্ত সচেতনতা দাবি করছিল। উইংসের আড়াল থেকে বেশ কয়েকবার অভিনেতাদের হাত দেখা গেছে, যা কাঙিক্ষত নয়। মঞ্চের গভীরতা কম ছিল, পাশে উইংয়ের ধারেও জায়গা নেই পর্যাপ্ত। এসব মাথায় রেখেও বলছি, যেহেতু এটা ইন্টিমেট স্পেস, তাই এমন পরিসরে কাজ করলে আরেকটু সচেতন হতেই হবে।
প্রপসের ক্ষেত্রেও সামান্য অসামঞ্জস্য চোখে পড়ে। যেমন মঞ্চে ব্যবহৃত জলের গ্লাস দুটি যখন কাঁসা বা পিতলের, তখন শেষ দৃশ্যে বাবা চরিত্রের হাতে একটি স্টিলের প্লেটে খই, ফুল ইত্যাদি নিয়ে চলে আসা চোখে লেগেছে। সেইসঙ্গে শেষ দৃশ্যের আগে কাঁসার গ্লাসগুলো সামনের টেবিল থেকে সরিয়ে নিলে অভিনেতাদের সাহায্য হতো। আসলে ইন্টিমেট মঞ্চে এ ধরনের ছোট পার্থক্যগুলো দৃশ্যের নান্দনিকতাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। পোশাক ও অলংকারের ক্ষেত্রেও একই কথা। বিন্দুবাসিনী চরিত্রে মৌটুসী বিশ্বাস যে পোশাক এবং হাতে পাথর বসানো চুড়িটি পরেছিলেন, তা নিয়ে একটু ভাবার অবকাশ রয়েছে বোধহয়। সময়কালের নিরিখে সদানন্দের আধুনিক পাঞ্জাবিও চোখে লাগছিল। আর একটি বিষয়, বিন্দুবাসিনী চরিত্রটি ঘরের ভেতরে জুতো পরে থাকলেও বাইরে থেকে আসা সদানন্দ বা তাঁর বাবার চরিত্রে থাকা সমরেন্দ্র দেবের পায়ে কোনও জুতো ছিল না। দলগত কাজের সামগ্রিক নান্দনিকতায় যা সামান্য হলেও প্রভাব ফেলে। পরবর্তী প্রযোজনায় এসবভক্ষেত্রে পরিচালক নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবেন। আসলে অন্তরঙ্গ থিয়েটারে অভিনয়ের মাইক্রো-ডিটেল, সংলাপের স্বাভাবিকতা, শরীরী ভাষা এবং দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক সবকিছু নিয়েই একটু বেশি ভাবতে হয়। ‘সোলমেট’-এর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটাই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বেশ কিছু মুহূর্ত এই নাটককে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
আজকের সময়ে ‘সোলমেট’ শব্দটির অর্থও অনেক বদলে গেছে। সোলমেট মানেই কি যে মানুষটি আমাদের সবসময় বুঝবে; নাকি যে মানুষটির সঙ্গে আমরা সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করি, অথচ শেষ পর্যন্ত তাকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়? এই ভাবনাও প্রযোজনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘সোলমেট’ দর্শকের সঙ্গে সহজেই একান্ত হতে পেরেছে। হাসিয়েছে, আনন্দ দিয়েছে, আবার সম্পর্কের কিছু চেনা মুহূর্তও সামনে এনেছে। সঙ্গীত বিদ্যালয়ের তুলনামূলক ছোট মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আমন্ত্রিত দর্শকদের সামনে প্রথম প্রযোজনা হিসেবে এই মঞ্চযাত্রা নিঃসন্দেহে ভীষণ আশাব্যঞ্জক। ছোট প্রেক্ষাঘর হলেও কানায়-কানায় ভর্তি হলঘর, কিছু দর্শকদের আসন না পেয়ে ফিরে যাওয়া, এসব কিন্তু প্রাপ্তি হয়ে রইল শিলচর থিয়েটারের। আর হ্যাঁ, ওই সন্ধ্যায় এছাড়াও আমন্ত্রিত দল আজকের প্রজন্ম থিয়েটার মঞ্চস্থ করে ইন্দ্রনীল দে-র লেখা ‘তিন পুতুলের গল্প’। অনুষ্ঠানের শুরুতে কাজি নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন জনান্তিকা ভট্টাচার্য। এবং এর সঙ্গে দুরন্ত নৃত্য-অভিনয় করেন জনান্তিকারই সুযোগ্য কন্যা সৃজনী দেব। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায়ও ছিলেন জনান্তিকা।












