কাছাড়ে ৬৫তম শিক্ষক দিবস উদযাপন, ২৯ জন কৃতী শিক্ষককে সংবর্ধনা
জনসংযোগ। শিলচর : “শিক্ষকরাই সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্যতম প্রধান কারিগর। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, সমাজ গঠন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি মহান দায়িত্ব,” শনিবার এখানে বঙ্গভবনে কাছাড় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ৬৫তম শিক্ষক দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন অসম সরকারের খাদ্য ও জনবণ্টন, আবাসন ও নগর বিষয়ক এবং সমবায় বিভাগের মন্ত্রী কৌশিক রায়। অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, ছাত্রছাত্রী, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একত্রিত হন। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে কাছাড়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৯ জন কৃতী শিক্ষককে তাঁদের নিষ্ঠাপূর্ণ পরিষেবা ও অবদানের জন্য সংবর্ধনা জানানো হয়।
সমবেত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী কৌশিক রায় শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষাগত ভবিষ্যৎ নয়, তাঁদের চরিত্র গঠন এবং জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণেও শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধুমাত্র পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করা বা পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, “একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যপুস্তক থেকে জ্ঞান প্রদান করেন না। একজন শিক্ষক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধও শেখান।”
মন্ত্রী কৌশিক রায় বলেন, একজন শিক্ষকের প্রভাব প্রায়শই শ্রেণিকক্ষের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তাঁর মতে, ছাত্রছাত্রীদের গঠনমূলক বছরগুলিতে শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা তাঁদের সারা জীবন প্রভাবিত করতে পারে। তিনি বলেন, “শিক্ষকরাই ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্ন দেখতে শেখান এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথ দেখান।” তিনি উল্লেখ করেন, একজন শিক্ষকের কথা ও পরামর্শ বহু বছর ধরে একজন শিক্ষার্থীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকতে পারে। মন্ত্রী বলেন, একটি দেশের শক্তি তার শিক্ষা ব্যবস্থার গুণমানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এবং শিক্ষকরাই সেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। মন্ত্রী রায় আরও বলেন, “শিক্ষকদের সম্মান করা মানে শুধু একটি পেশাকে সম্মান করা নয়। এর অর্থ হল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং সমাজের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।”

প্রযুক্তির কারণে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সময়ের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রকেও নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন মানবিক মূল্যবোধের বিনিময়ে না হয়, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন। মন্ত্রী রায় বলেন, “শিক্ষা শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।”
“শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল সচেতন, দায়িত্বশীল, মানবিক এবং সমাজের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ নাগরিক তৈরি করা।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার এই বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী কৌশিক রায় আরও বলেন, সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ছাত্রছাত্রীদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিরন্তর সাড়া দিতে হবে। প্রযুক্তি যেমন শিক্ষার নতুন নতুন সুযোগ এবং তথ্যের সহজলভ্যতা তৈরি করেছে, তেমনই একজন পথপ্রদর্শক ও পরামর্শদাতা হিসেবে শিক্ষকের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী শিক্ষার বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব নিয়েও বক্তব্য রাখেন। শিক্ষার প্রসারের ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষার আলো যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে, সমাজ তত বেশি সচেতন ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।” শিক্ষিত, প্রগতিশীল এবং দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষকদের নিষ্ঠার স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে সম্মান জানানোর গুরুত্বের ওপর তিনি জোর দেন। তিনি বলেন, শিক্ষক দিবস এমন একটি সুযোগ, যখন সমাজ শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি সেই সমস্ত ব্যক্তির অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে পারে, যাঁরা তাঁদের পেশাগত জীবন ছাত্রছাত্রীদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে উৎসর্গ করেছেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্তা, আইএএস, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শুভেচ্ছা জানান এবং জেলার শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার গুণমান উন্নত করা, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো শক্তিশালী করা এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কাজ করে চলেছে। জেলা আয়ুক্ত বলেন, কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই শিক্ষকদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, শিক্ষকদের মনোভাব ও অঙ্গীকার বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগ্রহণের অভিজ্ঞতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এর আগে স্বাগত ভাষণে কাছাড়ের বিদ্যালয় পরিদর্শক মিঠুন জহুরি, এইএস, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তাঁদের বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে অবদান রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যে শিক্ষকদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা আয়ুক্ত জাগৃতি কালওয়ার, এসিএস, শিলচর উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত তিওয়ারি এবং অন্যান্য আধিকারিক, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
অসম রাজ্য সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রী কৌশিক রায় এবং অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদীপ প্রজ্বলন করেন এবং ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। তাঁর জন্মবার্ষিকী শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সংগীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক মাত্রাও যোগ করে।
৬৫তম শিক্ষক দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল কাছাড় জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৯ জন কৃতী শিক্ষককে সংবর্ধনা প্রদান। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁদের নিষ্ঠাপূর্ণ পরিষেবা, অবদান, সাফল্য এবং ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগত ও সার্বিক বিকাশের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের সম্মানিত করা হয়। সংবর্ধিত শিক্ষকদের হাতে প্রশংসাপত্র, ঐতিহ্যবাহী গামছা এবং উপহার তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিপ্লব বিশ্বাস। তাঁর প্রাণবন্ত ও সুসমন্বিত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে আরও আকর্ষণ যোগ করার পাশাপাশি পুরো কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।












