,

কালিকাপ্রসাদের জন্মদিনে কলকাতায় বিরীণা পাঠকের ‘বাংলা-অসম মেলবন্ধন’

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : প্রয়াত সুরসাধক, লোকসংস্কৃতি গবেষক ও শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ৫৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত তিনদিনব্যাপী বিশেষ সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অসমের লোকসংগীত ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করলেন বিশিষ্ট কামরূপী লোকশিল্পী বিরীণা পাঠক। P. C. Chandra Group ও দোহার-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মসূচিতে বিরীণা পাঠকের অংশগ্রহণ বাংলা ও অসমের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে…

বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। গুয়াহাটি : প্রয়াত সুরসাধক, লোকসংস্কৃতি গবেষক ও শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ৫৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত তিনদিনব্যাপী বিশেষ সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অসমের লোকসংগীত ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করলেন বিশিষ্ট কামরূপী লোকশিল্পী বিরীণা পাঠক। P. C. Chandra Group ও দোহার-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মসূচিতে বিরীণা পাঠকের অংশগ্রহণ বাংলা ও অসমের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও একবার নতুন মাত্রা দেয়। তাঁর পরিবেশনা ও লোকসংগীত বিষয়ক কর্মশালার মধ্য দিয়ে কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে অসমের কামরূপী লোকগীতি, গোয়ালপাড়িয়া লোকগীতি ও বিহুর গান বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়।

বিরীণা পাঠকের এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে ব্যতিক্রম গ্রুপ। অসমের লোকসংগীত ও সংস্কৃতিকে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে তুলে ধরে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন আরও শক্তিশালী করার এই প্রয়াসকে ব্যতিক্রমের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে।

১৯৭০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বরাক উপত্যকার শিলচরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। মাটির গান, লোকজ সুর এবং বাংলার ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে বাংলা ও অসমের সাংস্কৃতিক পরিসরের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনে পরিণত করেছিল। লোকসংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও অসমের লোকসংস্কৃতির মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তা তাঁর সংগীতচর্চার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন।

কালিকাপ্রসাদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই তিনদিনের কর্মসূচিতে সেই সাংস্কৃতিক ভাবনাকেই সামনে রেখে অসমের লোকসংগীতকে কলকাতার শ্রোতা ও অংশগ্রহণকারীদের কাছে তুলে ধরেন বিরীণা পাঠক। প্রখ্যাত লোকশিল্পী রামেশ্বর পাঠকের সুযোগ্যা কন্যা বিরীণা পাঠক দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পিতার সংগীত-ঐতিহ্যকে বহন করে কামরূপী লোকসংগীতের চর্চা ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

দোহার-এর উদ্যোগে আয়োজিত লোকসংগীত বিষয়ক কর্মশালায় প্রায় ১৫০ জনেরও অধিক অংশগ্রহণ করেন। ১২ সেপ্টেম্বর অংশগ্রহণকারীদের কামরূপী লোকগীত, গোয়ালপাড়িয়া লোকগীত এবং বিহুর গান শেখান বিরীণা পাঠক। গান শেখানোর পাশাপাশি তিনি লোকসংগীতের ভাষা, সুর, তাল ও পরিবেশনের বিভিন্ন দিক নিয়েও অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর সেই অংশগ্রহণকারীরাই মঞ্চে উঠে শেখা গান পরিবেশন করেন। পাশাপাশি দোহার-এর শিল্পীরাও বিশেষ সংগীত পরিবেশন করেন।

এই আয়োজনের বিশেষ তাৎপর্য ছিল-অসমের লোকসংগীতকে বাংলার মাটিতে তুলে ধরার পাশাপাশি দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক সুন্দর পরিবেশ তৈরি হওয়া। ভাষার পার্থক্যকে অতিক্রম করে সুর, তাল ও ছন্দ কীভাবে মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে পারে, কর্মসূচির বিভিন্ন পর্বে তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা যায়।

তিনদিনের এই আয়োজনে কালিকাপ্রসাদের স্মৃতির সঙ্গে ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষকেও একসূত্রে যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে স্মরণ করা হয় বিশিষ্ট সংগীত ব্যক্তিত্ব কালী দাশগুপ্ত ও রণেন রায়চৌধুরীকে। বাংলা ও অসমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন অধ্যায়কে এক মঞ্চে তুলে ধরে এই বিশেষ আয়োজন দুই অঞ্চলের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।

১৩ সেপ্টেম্বর Tulip Hall-এ অনুষ্ঠিত বিশেষ সাংস্কৃতিক পর্বে বিরীণা পাঠক এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের পরিবেশনায় লোকসংগীতের মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। কালিকাপ্রসাদের সংগীতভাবনা, লোকসংস্কৃতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং বাংলা-অসমের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ভাবনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

বিরীণা পাঠক বলেন, “কালিকাপ্রসাদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এমন উদ্যোগ তাঁর সংগীতভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কালিকাপ্রসাদ সবসময় লোকসংগীতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর জন্মদিনে অসমের লোকসংগীতকে অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে একসঙ্গে গান গাইতে পারা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের ও আবেগের বিষয়। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু গান শেখাইনি, বরং সুরের মাধ্যমে দুটি অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছি। আমি যতটা সম্ভব বাংলায় বুঝিয়ে বুঝিয়ে তাঁদের গান শেখানোর চেষ্টা করেছি। তাঁরা গানের ভাষা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও গানের সুর, তাল ও ছন্দের সঙ্গে অসাধারণভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গানগুলি শিখেছেন এবং পরদিন নিজেরাই সেগুলি পরিবেশন করেছেন। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল অসমের ভাষা ও গান নিয়ে তাঁদের গভীর আগ্রহ।”

ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড. সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা ও অসমের লোকসংস্কৃতির এক অসাধারণ সেতুবন্ধন। তাঁর জন্মদিনে কলকাতার মাটিতে বিরীণা পাঠকের মাধ্যমে অসমের কামরূপী লোকগান, গোয়ালপাড়িয়া লোকগান এবং বিহুর সুর পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরীণা পাঠক শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নয়, অসমের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবেও এই অনুষ্ঠানে আমাদের সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। আমরা ব্যতিক্রমের পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। তাঁর এই উদ্যোগ বাংলা ও অসমের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

তিনি আরও বলেন, “কালিকাপ্রসাদের সংগীতভাবনার অন্যতম শক্তি ছিল মানুষের কাছে লোকসংগীতকে পৌঁছে দেওয়া। সেই ভাবনাকে সামনে রেখে বিরীণা পাঠক কলকাতার মানুষের সঙ্গে অসমের লোকসংগীতের যে সংযোগ তৈরি করেছেন, তা অত্যন্ত সুন্দর একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস। সুরের কোনও সীমারেখা নেই-এই আয়োজন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *