ছোট সংস্থাগুলি অনুষ্ঠান করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে বরাকের সংস্কৃতি — অভিযোগ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের
বরাককণ্ঠ প্রতিবেদন। শিলচর: শিলচর গান্ধী ভবনের দ্রুত সংস্কার, দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকা জেলা গ্রন্থাগারের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করে তা অবিলম্বে কার্যকর করা এবং নিউ শিলচর এলাকায় সংস্কৃতি চর্চার জন্য নতুন অডিটোরিয়াম তৈরি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে ফের সরব হল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ, শিলচর তথা সমগ্র বরাক উপত্যকায় সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরও গতিশীল, আরও বেগবান এবং আরও সর্বব্যাপী করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কম ভাড়ায় সরকারি অডিটোরিয়াম বা প্রেক্ষাগৃহ তৈরির দাবিতে ফের সুর চড়িয়ে মঞ্চের কর্মকর্তারা বলেন, জেলা গ্রন্থাগার শিলচরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং একটি জেলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেরুদণ্ড স্বরূপ, একটি সমৃদ্ধ জেলার পরিচয় বহন করে তার গ্রন্থাগার, ছাত্র-ছাত্রী, গবেষক, লেখক, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সবার জ্ঞান অর্জনের প্রধান কেন্দ্র হল জেলা গ্রন্থাগার, কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য সরকার বেশ কয়েকবার ডেডলাইন দিলেও আজ পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত সময়ে তা চালু করতে পারছে না যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হতাশাজনক এবং শিলচরের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রেমী মানুষের জন্য অপমানজনক, সরকারের এই চরম খামখেয়ালি ও উদাসীনতার কারণে শিলচরের সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো আজ ধ্বংসের মুখে এবং চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, শহরের বেসরকারি প্রেক্ষাগৃহগুলির আকাশছোঁয়া ভাড়ার চাপে ছোট ছোট সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলি যারা সারা বছর ধরে অত্যন্ত কষ্ট করে নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, লোকসংস্কৃতি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে বরাকের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতির বীজ বপন করছে তারা অনুষ্ঠান করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে তাদের পক্ষে অনুষ্ঠান করা সম্ভব হচ্ছে না, একটি ছোট অনুষ্ঠানের জন্য লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে হলে সেই সংস্থা কীভাবে চলবে এমন প্রশ্ন তুলেছেন তারা, মঞ্চের কর্মকর্তাদের সাফ ও স্পষ্ট কথা হল দেশ গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে সংস্কৃতি চর্চা, একটি সুস্থ সমাজ, সুস্থ মানসিকতা ও সুস্থ প্রজন্ম গড়তে সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই, সংস্কৃতি ছাড়া কোনো জাতি, কোনো দেশ এগোতে পারে না, কিন্তু এই সংস্কৃতি চর্চা বর্তমান সরকারের চরম উদাসীনতায় ও অবহেলায় এবং পরিকল্পনাহীনতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত অশুভ সংকেত এবং বরাকের সংস্কৃতির জন্য অশনি সংকেত, এদিকে পিএম শ্রী কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে বাংলা বিষয় চালু করা, বাংলা ভাষা শিক্ষক নিয়োগ করা সহ বিভিন্ন ভাষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবিও তুলেছেন মঞ্চের কর্মকর্তারা, কারণ বরাক উপত্যকা বাংলা ভাষা প্রধান অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ার সুযোগ না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং বাঙালি জাতির জন্য অপমানজনক, বরাকের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, শুধু তাই নয় আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার মুখে শিলচরের তীব্র যানজট নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিউ শিলচরে অডিটোরিয়ামের নামে যে অর্ধ সমাপ্ত ও পরিত্যক্ত প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে তার দ্রুত সংস্কারের দাবি তুলেছে মঞ্চ, কারণ প্রতি বছর পূজার সময় শিলচর শহরের যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক অজয় কুমার রায় সহ বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক মনোজ দেব, সাংস্কৃতিক কর্মী যশোবন্ত দাস, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং শিল্পী সন্তোষ চন্দ, বিশিষ্ট নাট্যকার সুবীর ভট্টাচার্য গান্ধীভবন সংস্কার এবং জেলা গ্রন্থাগার চালু নিয়ে সরকারের তালবাহানার কড়া সমালোচনা করেন এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন, মনোজ দেব সরকার ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন অবিলম্বে জেলা গ্রন্থাগারের কাজ শেষ করতে হবে, সংস্কার করতে হবে ঐতিহ্যবাহী গান্ধী ভবনেরও, তিনি এও বলেন নির্মীয়মান জেলা গ্রন্থাগারকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহ এবং উপরের হলঘরকে বরাকের গর্ব তথা দেশপ্রিয় কামিনী কুমার চন্দের নামে নামাঙ্কিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছে মঞ্চ, সেই ঐতিহাসিক দাবি পূরণ করতে তিনি সরকারের কাছে জোরালো আবেদন জানান, পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে বাংলা বিষয় চালু করা এবং ভাষা শিক্ষক নিয়োগের দাবি নিয়ে তারা শীঘ্রই জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানান তিনি, এসব দাবির সঙ্গে শিলচর রেলস্টেশনকে ভাষা শহীদ স্টেশন নামকরণ করার আবেগপ্রবণ ও ঐতিহাসিক দাবিটি যোগ করেন সুবীর ভট্টাচার্য, কারণ ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভাষা আন্দোলনের এগারো জন শহীদের রক্তে রাঙা এই উপত্যকা, সেই শহীদদের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাসকে তুলে ধরতে এই নামকরণ অত্যন্ত জরুরি, মঞ্চের অন্যতম কর্মকর্তা সন্তোষ চন্দের কথায় বর্তমানে গান্ধী ভবনের অবস্থা একেবারেই বেহাল ও জরাজীর্ণ, ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, ভেতরে আলো নেই, চেয়ার ভাঙা, একসময় এই গান্ধী ভবনই ছিল শিলচরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র, বহু ঐতিহাসিক সভা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে এখানে, অপরদিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের ভাড়া বাড়ছে ক্রমশ যা সাধারণ সংস্থার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে শহরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সংস্কৃতি ভবনও আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, সেদিকে অবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত সরকারের, যশোবন্ত দাস বলেন ন্যাশনাল হাইওয়ে পয়েন্টের কাছে থাকা পরিত্যক্ত অডিটোরিয়ামটি বর্তমানে বাজার শেডের রূপ নিয়েছে এবং সেখানে অসামাজিক কাজকর্ম চলছে, সেটাকে সংস্কার করে সংস্কৃতি চর্চার উপযোগী করে তোলা জরুরি, মূলত দক্ষিণ শিলচর অর্থাৎ নিউ শিলচর এলাকায় সংস্কৃতি চর্চার জন্য একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাগৃহ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি, কারণ ওই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষকে একটি ছোট অনুষ্ঠানের জন্য শহরের এপারে ছুটে আসতে হয় যা সময় ও অর্থের অপচয়, অজয় রায় বলেন জেলা গ্রন্থাগারের কাজ শেষ করার আশ্বাস বহুবার দেওয়া হয়েছে কিন্তু কবে নাগাদ শেষ হবে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা, তিনি বলেন শিলচরে সংস্কৃতি চর্চার আলাদা পরিসর রয়েছে, আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে, বহু প্রতিভাবান শিল্পী বেরিয়েছেন শিলচর থেকে যারা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সুনাম অর্জন করেছেন, এই দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি চর্চার জন্য সরকারি ভবনগুলো সংস্কার এবং নতুন ভবন গড়ে তোলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত সরকারের, তিনি এও বলেন নিউ শিলচরে থাকা পরিত্যক্ত অডিটোরিয়ামটি এখন ভুতুড়ে ঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে, দিনের বেলাতেও সেখানে কেউ যেতে ভয় পায়, সেদিকে প্রশাসনের কোনো নজর দেওয়া হচ্ছে না যা অত্যন্ত দুঃখজনক, অন্যদিকে তিনি জানতে পেরেছেন নিউ শিলচর এলাকায় নতুন অডিটোরিয়ামের জন্য কয়েক লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে কিন্তু উপযুক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না বলে নতুন অডিটোরিয়াম গড়ে তোলার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে ট্রান্সপোর্ট অফিসের বিশাল খালি জমি পড়ে রয়েছে সেই জমিকে কাজে লাগিয়ে সেখানে নতুন অডিটোরিয়াম গড়ে তোলার সুপারিশ করেন তিনি, পাশাপাশি তিনি পূজার মুখে শহরকে যানজটমুক্ত করতে ট্রাফিক বিভাগকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান এবং সবশেষে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন সরকার যদি এই ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত পূরণে পদক্ষেপ না নেয় তাহলে শিলচরের সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তারা আগামীতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন।












