রেজিনগর। ৮ অক্টোবর: উপনির্বাচনের দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিনই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন বাবরি মসজিদের আদলে মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর।
গ্রেপ্তারের ঘটনা: মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রেজিনগর আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর কিছুক্ষণ পর তাকে আটক করা হয়। ভোটগ্রহণ শুরুর পর হুমায়ুন কবির ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলেন। পরে একটি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য দলীয় কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে রেজিনগরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির কার্যালয় থেকে পুলিশ তাকে আটক করে রেজিনগর থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের গাড়িতে তোলার সময় হুমায়ুন বলেন, “আমি জানি না আমাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, নাকি আটক করা হচ্ছে।”
বিজেপি প্রার্থী শঙ্করাভ সরকার অভিযোগ করেন, ভোটের কয়েক দিন আগে হুমায়ুন বলেছিলেন ভোটের দিন ১০ জনের মৃত্যু হবে এবং তিনি দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করছেন। পুলিশ সদস্যদের গালিগালাজ করার অভিযোগেও তাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পুলিশের সঙ্গে বিস্তর টানাহেঁচড়ার পর নওদার বিধায়ককে গাড়িতে তোলা সম্ভব হয়।
কান্নায় ভেঙে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা: তাঁর মেজাজ তিরিক্ষি বলে পরিচিত। বল লাইনের বাইরে গেলেই হাতা গুটিয়ে নেন, আঙুল তুলে তেড়ে যান। কিন্তু বুধবার উপনির্বাচন মিটতেই সেই মানুষটিই বদলে গেলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন, কিন্তু গলা থেকে কান্না যেন উথলে উঠছিল।
হুমায়ুন বলেন, “সিপিএমের সময়ে ক্যাডাররা ভোট করত। পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখত। এখন পুলিশ ক্যাডারের ভূমিকায় নামল। এ রাজনীতিতে থাকতে চাই না। আমি রেজিনগরের মানুষের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”
মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ: ভোট লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে কাঠগড়ায় তোলেন তিনি। তার দাবি, নবান্নে ডেকে শুভেন্দু অধিকারী নিজে তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তার ছেলে অন্তত ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবে। কিন্তু বাস্তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বেই পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোট লুণ্ঠন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত: ক্ষোভ উগরে দিয়ে হুমায়ুন জানান, তিনি বিধায়ক পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। প্রয়োজনীয় প্রয়োজনে বিধানসভায় গেলেও আদালতের বা বিধানসভার কোনো কমিটির বৈঠকে অংশ নেবেন না। এমনকি বিধানসভার কক্ষে মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে তিনি সেখানে পা রাখবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন। বুধবার তাকে দৃশ্যতই দিশেহারা লেগেছে। কখনও বলেছেন বিধানসভাতেই যাবেন না, কখনও বলেছেন শুভেন্দু কক্ষে থাকলে যাবেন না। কখনও বলেছেন বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেবেন, আবার কখনও বলেছেন নওদার মানুষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে যা করার করবেন।
প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের ভোটে মুর্শিদাবাদের নওদা এবং রেজিনগর দুটি আসন থেকেই জিতেছিলেন হুমায়ুন। নওদা রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন হয়। এই উপনির্বাচনে তার দলের প্রার্থী ছিলেন তারই পুত্র গোলাম নবি আজাদ। একদা কংগ্রেস নেতা, তারপর তৃণমূল, মাঝে বিজেপি ঘুরে আবার তৃণমূল ছেড়ে নতুন দল গড়ে বিধায়ক হওয়া – রাজনীতি থেকে বাবরি মসজিদ, হুমায়ুন মানেই নানা রঙের দিনগুলি।
প্রতিক্রিয়া: মঙ্গলবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, রেজিনগরে সংখ্যালঘু মহিলা ও যুবদের ভোট বিজেপি পেয়েছে। বুধবার হতোদ্যম হুমায়ুনও জানিয়ে দিলেন, রেজিনগরে জিততে চলেছে বিজেপি। পুলিশকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে নন্দীগ্রাম থেকে শুভেন্দু বলেছিলেন, “আমি মুখ্যমন্ত্রী। আমিও যদি পুলিশকে হুমকি দিই, আমার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ হবে।” বরাহনগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ বলেন, “ওঁর বিধানসভায় না-আসাই ভাল। উনি মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে আমরা বিধায়করাই ওঁকে বুঝিয়ে দেব। এখন কুমিরের কান্না কেঁদে লাভ নেই।”












