,

শিলচর শহর: উন্নয়নের মডেল, না মৃত্যুফাঁদের শহর?

কোটি টাকার বিল, শূন্য রাস্তা — প্রাণ হাতে নিয়ে চলছে ৪ লক্ষ মানুষ বিশেষ প্রতিবেদন, শিলচর: একটু বৃষ্টি মানেই শিলচর শহর দ্বীপ। রাস্তা নেই, আছে শুধু খানা-খন্দে ভরা মৃত্যুফাঁদ। গাড়ি তো দূরের কথা, বাইক, স্কুটি, অটো — কিছুই চলছে না। যাত্রীরা প্রাণ হাতে নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করছেন। প্রতিদিন দুর্ঘটনা, প্রতিদিন হাসপাতাল। ৪ লক্ষ শহরবাসীর নিত্যদিনের…

কোটি টাকার বিল, শূন্য রাস্তা — প্রাণ হাতে নিয়ে চলছে ৪ লক্ষ মানুষ
বিশেষ প্রতিবেদন, শিলচর: একটু বৃষ্টি মানেই শিলচর শহর দ্বীপ। রাস্তা নেই, আছে শুধু খানা-খন্দে ভরা মৃত্যুফাঁদ। গাড়ি তো দূরের কথা, বাইক, স্কুটি, অটো — কিছুই চলছে না। যাত্রীরা প্রাণ হাতে নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করছেন। প্রতিদিন দুর্ঘটনা, প্রতিদিন হাসপাতাল। ৪ লক্ষ শহরবাসীর নিত্যদিনের যন্ত্রণা এখন শিলচরের আসল চিত্র।

১. রাস্তা না, যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা
শহরের তারাপুর, মালুগ্রাম, রাঙ্গিরখাড়ি, নরসিংটলা, হাইলাকান্দি রোড, শিলচর-বদরপুর রোড — কোথাও রাস্তা আস্ত নেই। বড় বড় গর্তে জল জমে ডোবার আকার নিয়েছে। নিচে কত ফুট গর্ত, উপর থেকে বোঝার উপায় নেই। সামান্য ১০ মিনিটের বৃষ্টিতেই সেই গর্ত ভরে যায় কাদা-জলে।

ফলাফল ভয়াবহ। গাড়ির চাকা গর্তে পড়েই সাসপেনশন ভেঙে যাচ্ছে। বাইক-স্কুটির চাকা স্লিপ করে পড়ে গিয়ে আরোহীর হাত-পা ভাঙছে। অটোচালকরা রাস্তায় গাড়ি নামাতেই ভয় পাচ্ছেন। এক অটোচালকের কথায়, “দাদা, রাস্তায় নামলেই লোকসান। দিনে ১০ বার গাড়ির পার্টস ভাঙে। কামাই হয় ২০০ টাকা, সারাই লাগে ৫০ টাকা।”

যাত্রীরা বলছেন, “প্রাণ হাতে নিয়ে অফিস যাই, স্কুল যাই। কখন গর্তে পড়ে যাই, কখন গাড়ি উল্টে যায় — তার ঠিক নেই। বৃদ্ধ, বাচ্চা, প্রেগন্যান্ট মহিলা — কেউই নিরাপদ নন।”

২. স্পন্ডিলাইটিসের রাজধানী হয়ে উঠছে শিলচর
ডাক্তাররা বলছেন, প্রতিদিন শত শত রোগী আসছেন কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, স্পন্ডিলাইটিস, হাঁটুর ব্যথা নিয়ে। ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনিতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে লাইন পড়ে যাচ্ছে।

একজন রোগীর কথায়, “রোজ অফিস যেতে-আসতেই শরীর শেষ। ৩০ বছরের ছেলের কোমর ৬০ বছরের মতো। ডাক্তার বললেন, রাস্তা ঠিক না হলে ওষুধেও কাজ হবে না।”

৩. কোটি টাকার ক্ষতিয়ান, শূন্য বাস্তব
সরকারি ফাইল বলছে, গত ৫ বছরে শিলচর শহরের রাস্তা, ড্রেন, জলনিকাশির জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। পুরসভা, PWD, জলসম্পদ দফতর — সবাই “উন্নয়নের গল্প” শোনায়। খবরের কাগজে রোজ “শিলচরের উন্নয়ন” এর বিজ্ঞাপন ছাপা হয়।

কিন্তু বাস্তব? বাস্তব বলছে অন্য কথা। জনগণ দুর্ভোগের শিকার। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো গর্ত ভরাট হয়। মাটি-খোয়া ফেলে ২ দিনের মাথায় আবার সেই গর্ত। কাজের গুণমান নিয়ে বড় প্রশ্ন। বরাদ্দের টাকা কোথায় গেল, কত মিটার রাস্তা হল, কত ড্রেন হল — তার স্বচ্ছ শ্বেতপত্র চাইছেন নাগরিকরা।

৪. ভোট এলেই জাগে প্রশাসন, ভোট গেলেই ঘুম
সবচেয়ে বড় বৈষম্য চোখে পড়ে নির্বাচনের ১ মাস আগে। কোনো মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা বড় নেতা আসবেন — খবর পেলেই রাতারাতি জাদু। ভাঙা রাস্তা এক রাতেই পাকা। VIP-র গাড়ি যাতে ঝাঁকুনি না খায়, তাই কোটি টাকা খরচ করে নতুন কার্পেটিং। সাথে বসে কয়েক লক্ষ টাকার ঝাঁ-চকচকে শুভেচ্ছা গেট। “স্বাগতম”, “অভিনন্দন” — লেখা ঝলমল করে।

নির্বাচন মিটতেই সব শেষ। সাধারণ মানুষের জন্য সেই ভাঙা রাস্তা, সেই জমা জল, সেই কাদা। মন্ত্রীদের আসা-যাওয়ায় যাতে কষ্ট না হয়, তাই রাতারাতি গর্ত ভরাট হয়। কিন্তু যাদের ভোটে সরকার গড়ে ওঠে, সেই জনগণ কি মানুষ নয়? এরা কি কষ্ট পায় না? — ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন শহরবাসী।

এক নাগরিকের প্রশ্ন, “VIP-র মেরুদণ্ড আছে, আমাদের মেরুদণ্ড নেই? ওনাদের ঝাঁকুনি লাগলে ক্ষতি, আমাদের ঝাঁকুনিতে স্পন্ডিলাইটিস হলে ক্ষতি নেই?”

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে স্কুল — সব অচল
ভাঙা রাস্তার জন্য শিলচরের ব্যবসা-বাণিজ্যেও মার। পণ্যবাহী ট্রাক শহরে ঢুকতে পারছে না। দোকানে মাল আসছে দেরিতে, দাম বাড়ছে। স্কুলের বাচ্চারা রোজ কাদা মেখে স্কুল যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছে না। জরুরি পরিষেবাও ভেঙে পড়েছে।

নাগরিকদের ৫ দফা দাবি:
১. গত ৫ বছরে শিলচর শহরের রাস্তা-ড্রেনের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তার শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।
২. বরাদ্দের টাকায় কত কিলোমিটার রাস্তা, কত কিলোমিটার ড্রেন হয়েছে — তার ফিজিক্যাল অডিট করতে হবে।
৩. নিম্নমানের কাজ করা ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. VIP রাস্তার মতো সাধারণ মানুষের রাস্তাও এক রাতেই পাকা করতে হবে।
৫. বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কার ও জলনিকাশির স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।

শেষ কথা: হিসেব চাই, কাজ চাই
শিলচরবাসী এখন আর প্রতিশ্রুতি চায় না। চায় পাকা রাস্তা। চায় বাঁচার মতো পরিবেশ। বরাদ্দের টাকার ঠিকঠাক হিসেব আর জবাবদিহি থাকলে শিলচর শহরের রাস্তার এই বেহাল দশা হতো না।

প্রশ্ন একটাই — কোটি টাকা কোথায় গেল? কাজ কবে হবে? উত্তর দেবে কে?

 

One response to “শিলচর শহর: উন্নয়নের মডেল, না মৃত্যুফাঁদের শহর?”

  1. Dilip Kumar Dey Avatar
    Dilip Kumar Dey

    Bill for repair of roads are made without actual repair or even without facelift. Public money is consumed at. high. level. Political representatives are silenced.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *